Header Ads

Header ADS

ডার্ক সাইট অফ এ বিউটিফুল লেডি - দোলনা বড়ুয়া তৃষা | পর্ব - ০১-০৬

ডার্ক সাইট অফ এ বিউটিফুল লেডি এই উপন্যাস টা আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য এক দুনিয়ার। জানতে হলে পড়তে হবে ডার্ক সাইট অফ এ বিউটিফুল লেডি

ডার্ক সাইট অফ এ বিউটিফুল লেডি 





ধারাবাহিক উপন্যাস 

পর্ব - ০১,২,৩,৪,৫,৬

দোলনা বড়ুয়া তৃষা


টেবিলের অপর প্রান্তে বসে আছে অতি সুন্দরী একজন মহিলা, ফাইলে তার বয়স ৩১ লেখা আছে বলেই মহিলা বলছি, তাকে দেখে সদ্য ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে মনে হচ্ছে। অতি সুন্দরী মহিলারা অপরিচিত কারো কাছে নিজেকে আরো সুন্দর করে ধরার চেষ্টা করে। এই মোটেও তা করছে না। কোন পুরুষ ডাক্তার হলে হয়ত করতো মহিলা ডাক্তার বলেই হয়ত সে আমাকে পাত্তায় দিচ্ছে না। সুন্দরী মেয়েরা অন্য মেয়েদের পাত্তা না দেওয়ার সূক্ষ্ম একটা ইগো থাকে। অজান্তেই থাকে এইটা। এইটাকে দোষ বলা যায় না। তারা এমন পরিবেশ পেয়ে থাকে বুদ্ধি বয়স থেকে। 

এক মনে সে ফ্যাশন ডিজাইনের ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছে। গত মাসের ওটা। 

এই মেয়ে দেখে রবীন্দ্রনাথ  কয়েক দফা সুরের ছন্দ রচনা করে ফেলতে পারতো। কিংবা হুমায়ূন আহমেদের গল্পের ভয়ংকর সুন্দরী নায়িকার সাথে তুলনা করা যায়। আমি

আমার বয়স চল্লিশ পার হলেও আমিও মুগ্ধ না হয়ে পারছি না। 

কিন্তু এই মেয়েটা ছয়টা খুনের আসামী। তার বিরুদ্ধে কোন জুতসই প্রমাণ যোগাড় করতে পারে নি তাকে আসামী বানানো ফ্যামিলি বা এত দিন রিমান্ডে রাখা পুলিশেরা। 

মেয়েটাকে দেখে কেউ বিশ্বাস করছে  না। ভাবছে শ্বশুড়বাড়ির লোকজন মিথ্যা ফাসাচ্ছে। তবে ওর কিছু হাবভাব দেখে আমার কলেজের ব্যাচমেট খালিদা মনে হলো ওর কাউন্সিলিং প্রয়োজন। তাই আমার কাছে পাঠানো হয়েছে। অনেক বছর যুক্তরাজ্যে থাকার পর দেশে ফিরলাম বছর তিনেক আগে। খুব একটা ইন্টারেস্টিং কেস পাই না। এইখানে যারা ভয়াবহ পাগলামী করে তাদের কাউন্সিলিং জন্য পাঠানো হয়। যাদের কারণ দেওয়াই থাকে। কেউ জম্মগত, কেউ drugs addicted.   স্বাভাবিক দেখতে  কোন মানুষ আসে না, যাদের সমস্যা বুদ্ধি দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। 

আমি ওর দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বললাম,

- পানি খাও, 

ও ম্যাগাজিন টা ভাজ করে ঠিক জায়গায় রেখে বলে, 

-কেন  ওখানে কিছু মিশিয়ে দিয়েছেন? 

ম্যাগাজিন টা যেভাবে ছিলো সেভাবেই রেখেছে এতে বুঝা যায় ওর গুছিয়ে রাখার স্বভাব আছে। একটু বেশিই আছে। কারণ সে ছড়িয়ে রাখা কলম গুলো গুছিয়ে রাখছে। 

আমি হেসে বললাম, 

-মোটেও না।

সে আমার নেম প্লেট টা খুব তাচ্ছিল্যের সাথে বাকা থেকে সোজা করে বলে, 

- মাহাবুবা খানম। আপনার নাম টা মোটেও আপনার সাথে যায় না। এত স্মার্ট একজন ডাক্তার আপনার নাম হওয়া দরকার ছিলো আরো আধুনিক।  

আমি খুব আগ্রহ নিয়েই বললাম, 

-যেমন? 

ও কিছুক্ষন চিন্তা করে বলে, এখন  কিছু মাথায় আসছে  না।

- আচ্ছা সময় নাও। ভেবে বল কি রাখা যায় আমার নাম? তবে তোমার নাম টা সুন্দর, ময়ূরাক্ষী। তোমার শর্ট নাম কি? ময়ূ নাকি রাক্ষী? 

ও খুব সুন্দর করে হাসল। হাসতেই একটা গজ দাঁত বেড়িয়ে এলো। সত্যিই সুন্দর লাগছে ওকে। 

-আপনি আমাকে বাচ্চাদের মতো ইনফুলেন্স করার চেষ্টা করছেন। যা করার মোটেও কোন দরকার নেই। আপনার যা জিজ্ঞেস করার তা করতে পারেন৷ আমি উত্তর দেব আমার মতো আপনি ধরতে পারলে ধরবেন।  না পারলে আবার পাঠিয়ে দেবেন। 

-কোথায়? যেখান থেকে এসেছো? তোমার কি বাড়ির থেকে জেলেই বেশি ভালো  লাগছে নাকি?

চুপ করে একমনে দেওয়াল ঘেঁষে রাখা বনসাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে ও। 

- আপন মানুষ না থাকলে আপনি খোলা মাঠ কেও জেল ভাববেন। চার দেওয়াল কে ঘর। 

-তুমি কি তোমার স্বামীকে মিস করছো? 

ময়ূরাক্ষী আরেক দফা হাসে তবে এই হাসিতে অবজ্ঞা। 

-যার খুনের চার্জ আমার উপর,  তাকে মিস করব এমন ভাবছেন কেন? 

- তাহলে? মা বাবা? উনারা তো মারা গিয়েছে অনেক আগে। 

ওর চেহেরাটা কিছুটা শক্ত হয়ে যাচ্ছে বিশেষ করে চোয়াল টা। আমি আস্তে আস্তে ওকে পড়ার চেষ্টা করছি আর ধীরে ধীরে লিখছি। 

মেয়েটা যতটা সুন্দর তত টা ভয়ংকর শক্ত মন।

সে মোটেও ঘাবড়ে যাচ্ছে না কোন কথায়। কিংবা প্রচন্ড রকম আত্মবিশ্বাসী।  

- তোমার কি এমন রাগ ছিলো যে এক পরিবারের ছয় কে তুমি খুন করেছো? তাও নিজের। 

-আমি কাউকে খুন করি নি। ওরা ওদের কর্মফল ভোগ করেছে। 

- কর্ম টা কি ছিলো? 

আবারো চুপচাপ সময় কাটছে। আমার পিএ সাহেলা মাথা ঢুকিয়ে দেখল। ওকে ইশারায় অন্যদের পাঠিয়ে দিতে বললাম।

-তুমি কি চা খাবে? দিতে বলব? 

একটা নিশ্বাস ফেলে বলে, বলতে পারেন। অনেক দিন ভালো চা খাই না। আবার কখন বের হবো জানি না। 

-তোমার কি নিজেরেই ইচ্ছে নেই মুক্তি পাওয়ার? নিজের জন্য কোন ডিফেন্স কেন করছো না? 

- আমি যা করি নি তার দোষ আমি কীভাবে স্বীকার করব কিংবা কীভাবে ডিফেন্স করব? 

- তাহলে তুমি সেসব খুন করো নি? কে করেছে? 

চা এসে গেল, চা খেতে খেতে ওর চোখের মণিটা কিছুটা খুলে যাচ্ছে। সত্যিই হয়ত ওর চা টা ভালো লেগেছে। 

- আচ্ছা এইসব কথা বাদ দাও। আমাকে তোমার কথা বলো তোমার ছোট বেলা। মজার স্মৃতি। প্রেমিক দের কথা বলো। সুন্দরী মেয়েদের অনেক প্রেমিক থাকে। 

আমি হাসার চেষ্টা করি, ওর চেহেরার খুশিটা চলে যাচ্ছে চোয়াল টা শক্ত হচ্ছে আবার। 

- আমাদের এই দেশে কালো মেয়েদের যত টা খারাপ ভাবে ট্রিট করা হয় তারচেয়ে বেশি জঘন্য ভাবে ট্রিট করা হয় সুন্দরী মেয়েদের। 

-আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমাদের দেশে তো সুন্দরী মেয়েদের অনেক কদর রীতিমতো ডিমান্ড বলা যায়। 

ও আবার তাচ্ছিল্য সুরে হাসে। ম্যাগাজিন টা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,  এই যে এই খোলামেলা পোশাকে মেয়েটা,  নিসন্দেহে সুন্দরী তবে সে ভার্জিন হোক বা ডির্ভোসি, ওকে দেখে সবার চোখ শান্তি পায়, তবে অজান্তে ওদের চেহেরাটা দেখলে সবার মনে যে শব্দ টা হুড়মুড় করে৷ তা হলো মাগি, নিসন্দেহে এদের বিছানায় নিয়ে যাওয়া যায়।কালো মেয়েরা নিজেদের মন বা চরিত্র নিয়ে গর্ব করে তবে ফর্সা মেয়েদের এইসব করার কোন কারণ থাকে না। 

-তোমার কি বাজে অভিজ্ঞতা আছে এইটা নিয়ে? 

-আমি সুন্দরী কারণ আমার মা সুন্দরী আর সারাজীবন মাকে কান্না ছাড়া কিছুই করতে দেখি নি। কারণ বাবা মাকে সন্দেহ করতো। বাবা না থাকলে কোন আত্মীয় স্বজন বাসায় আসা মায়ের কাছে এক প্রকার আতংক।  যেকোন বিল নিতে আসা ছেলেদের ও ছুটির দিনে আসতে হতো,  মা দরজা খোলতো না। এমন কি নিজের ভাইয়েরাও আসতে পারতো না। বাবার বিচ্ছিরি কথা ছাড়তো না, মায়ের ভাই কিংবা বাবাকেও। 

বাবার কলিগরা আসতে চাইতো বাসায়। মা ভয়ে থাকতো এই বুঝি কেউ আবার মায়ের রূপের প্রশংসা না করে দিলো। বাবা ওদের সাথে তাল মিলিয়ে প্রশংসা করলেও মধ্যরাতে মায়ের গোঙ্গানিতে আমার ঘুম হতো না। মেয়েদের বিশেষ জায়গায় আঘাত করতো যেটা তাদের বিশেষ ক্ষমতা মনে করতো পুরুষেরা। 

এক রাতে মা আত্মহত্যা করলো। সেদিন আমি একটু ও কান্না করি নি। আমার মনে হলো মা মারা গিয়ে বেঁচে গেলো। মাকে স্নান করানোর দায়িত্ব আমার ছিলো, মায়ের যৌনাঙ্গের আশেপাশে প্রচুর সিগারেটের ছ্যাকা ছিলো। 

আমি একটু পানি খেলাম। আমার ভীষণ রকম গলা শুকিয়ে আসছে ওর কথায়, ভয়ে না ঘৃণায়। 

-এরপর তোমার বাবা বিয়ে করেন নি? 

- না, মা মারা যাওয়ার ১৪ দিনের মাথায় বাবা হার্ট এট্যাকে মারা যায়। 

আমি এইবার ভ্রু কুচকে তাকালাম, ওর মন টা এত শক্ত হওয়ার ব্যাপার টা ধরতে পারছি। 

-এতে কি তোমার কোন হাত ছিলো?

ভীষণ নিস্পৃহ গলায় বলল, 

- না, আমি তখনো মাত্র চৌদ্দ বছরের কিশোরী ছিলাম। 

ভীষণ নিস্পৃহ গলায় বলল, 

- না, আমি তখনো মাত্র চৌদ্দ বছরের কিশোরী ছিলাম। 

তাও ওর দিকে সন্দেহ চোখে তাকিয়ে আছি দেখে ও বলল, 

- প্রথম থেকে আমাকে খুনী ভাবলে আপনি আমার গল্প শুনতে পারবেন না। 

- আচ্ছা ভাবছি না। তারপর?  

- বাবা মারা যাওয়ার পর আমি দাদু দিদিমার সাথে মামার বাড়ি গিয়ে থাকতে শুরু করলাম। মায়ের সুন্দরী হওয়ার কারণ ছিলো দিদাও সুন্দরী ছিলেন। দিদার বয়স তখন ষাট তবে দাদুর সন্দেহ তখনো শেষ হয় নি। সারাক্ষন চোখে চোখে রাখতেন। সবাই ভাবতো কত ভালোবাসা এখনো। তবে আমি বুঝতাম দিদার ভাগ্য মায়ের চেয়ে খুব একটা ভালো না। 

আমি নিজের মতো পড়ালেখা করতাম, রুমে একা থাকতাম। প্রায় দিদা থাকতো আমার সাথে। মামীই জোর করে পাঠাতো, হয়ত নিজের  ছেলের প্রতি উনার বিশ্বাস ছিলো না। 

আমি মাঝেমধ্যে বারান্দা থেকে আমার ব্রা খুঁজে পেতাম না। আমার মামাতো বোনের কাছে জিজ্ঞেস করতেই ও তেড়ে আসে। 

-তোর কি ধারণা আমি তোর ব্রা পরি লুকিয়ে? 

- তা না৷ খুঁজে পাচ্ছি না তাই। 

মামী বিরক্ত মুখে খুঁজে এনে দেয়, পরতে মানা করে। আগে ধুয়ে নিতে বলে, প্রথমে বুঝতে না পারলে বুঝতে সময় লাগলো মামী ওটা উনার ছেলে বিত্তের ঘর থেকে আনতো। 

তখনো আমি ছেলেদের মাস্টারবেশন সর্ম্পকে জানতাম না। তবে আচ করতাম। 

তো সতের বছর বয়েসে আমি প্রথম রেপড হই  ছাব্বিশ বছর বয়েসী বিত্তের হাতে। সেদিন পিরিয়ড হওয়ায় কলেজ থেকে দ্রুত ফিরলাম। জানতাম না সবাই দাওয়াতে গিয়েছে। বিত্ত দরজা খুলে এক গাল হেসে। আমি দ্রুত রুমে গিয়ে প্যাড নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যাই। 

ফিরে এসে দেখি বিত্ত বিছানায় বসে আছে, রুমের দরজা লক। 

আমার হাত পা কাঁপছে। এই ব্যাপার গুলো অনেকের কাছেই শুনি প্রতিবারেই কেঁপে উঠি। তাও শুকনো গলায় বললাম, 

-তারপর? 

বড় স্বাভাবিক গলায় বলল,

- আর কি, সে আমাকে রেপ করল সে অবস্থায়। মানা করলাম শুনল না। বললাম পিরিয়ড শেষ হলে নিজে আসবো। তাও সে এই সুযোগ কোন মতেই হাত ছাড়া করতে চায় না। 

আমি পেন্সিল টা কাগজে  বুলাতে বুলাতে বললাম,

- সে কি এখনো বেঁচে আছে? 

ও খুব বিরক্ত হলো উঠে যেতে যেতে বলল, আপনাকে আগেই বলেছি, আগে থেকে আমাকে খুনী ভাবলে আমার গল্প শোনাবো না। 

-আচ্ছা ঠিক আছে। সরি। বসো তুমি।

শাড়ির পার টা হাতের উপর তুলে দিয়ে আবার বসল। ওর হাল্কা চর্বি জমা সুন্দর পেট টা দেখা যাচ্ছে। 

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, হ্যাঁ ও বেঁচে আছে। তবে অসুস্থ। শেষের দিকে ওর সাথে আমি স্বেচ্চায় করতাম। বেশ মজা পেতে শুরু করেছিলাম। 

মামী কীভাবে যেন এক দিন আমাদের হাসির শব্দ শুনে ফেলে, আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়, আমি এক হোস্টেলে উঠি। ওখানে কয়েক জন বান্ধবী মিলে ভালোই কাটছিল সময়, তবে একদিন ওরা সবাই মিলে আমাকে মদ খাওয়ালো। এরপর আমার কিছু মনে নেই। মনে হলো কয়েক জনে আবছা কিছু ছায়া দেখেছিলাম। আর ছুয়ে যাচ্ছে আমার শরীর। 

যখন বুঝতে পারলাম কি হচ্ছে, তার আগেই ওরা সবাই রুমে ছেড়ে পালিয়ে গেল। 

 নিজের শরীরের প্রতি আমার ঘৃণা আসতে শুরু করে। নিজেকেই নিজের শত্রু মনে হতো। 

-তারপর? 

- তারপর আর কি, এইভাবে প্রতি পদে পদে এইভাবে আমার শরীর নির্যাতিত হত।কলেজের অধ্যাপক কিংবা হোস্টেলের দারোয়ান কেউ যেন একটা সুযোগ মিস করতে চায় না। সব সময় আমি উপভোগ করতে পারতাম না। রাতে ঠিকঠাক ঘুম হত না। ঘুমালেই মনে হত এই বুঝি আবার কেউ এসে চেপে ধরলো। একসময় গিয়ে আমি সারাদিন রাত মিলে এক ফোটাও ঘুমাতাম না। অনেকটা মেডিটেশন করার মতো শুয়ে থাকতাম। 

মামীর বোনের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তুহিনের সাথে আমার বিয়ে হয়। সেও আমার রূপেই মুগ্ধ ছিলো।  আমার আশেপাশে আর কিছু ওর কিছু যায় আসে না।  আমাকে নিয়ে ওর মনে প্রশ্ন আসলেও সে আমাকে প্রশ্ন করে নি আগে কি কি হয়েছে আমার সাথে? 

কিংবা সেও ভেবে নিয়েছিলো সুন্দরী মেয়েরা এমনিই। 

 কখনো সখনো বলার চেষ্টা করতাম ওকে, তবে হু হু করলে ও মগ্ন থাকে আমার শরীরে প্রতিটা ভাজে। উত্তাল হতো, ভূপিকম্প তুলতো আমি তাল মেলালেও আমার  বিরক্ত কোনদিন ওর চোখে পড়ে নি। তবে ওর বুকে নিশ্চয়তা পেয়েছিলাম । আবার রাতে ঘুমানো শুরু করি। 

- ও কি তোমাকে অত্যাচার করতো ? 

- না। 

- তাহলে কেন ওকে মিস কর না। আর এইভাবে ওর মৃত্যুতে সবাই কেন তোমাকে দায়ী করছে। 

- ওরা কেউ আসল সত্য টা জানাতে চায় না তাই এইটা ছড়িয়েছে। আমি ওদের কে খুন করেছি। 

- কিন্তু কেন করছে ওরা? 

তুহিনের সাথে বছর খানিক সংসার করেও ও আমাকে বুঝতে পারতো না। আমিও পারতাম না  মাঝেমধ্যে অচেনা লাগতো ওর স্পর্শ ঘুমের মধ্যে, ওর গায়ের গন্ধ। 

- আলাদা অলাদা লাগতো কি সব গন্ধ? 

ও কিছুটা চমকে উঠে, চোখের দৃষ্টি আবারো ফাঁকা,  রুমের এক দিকে তাকিয়ে আছে। যেন কাউকে দেখছে ও। 

আমি আবার বললাম, 

- তুমি বুদ্ধিমতি মেয়ে, তুমি নিশ্চয় ধরতে পেরেছিলে তোমার সাথে শুধু তুহিন থাকতো না। আরো কেউ আসতো যখন তুমি গভীর ঘুমে। তাই তো? 

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও,

- হ্যাঁ আমি ধরতে পেরেছিলাম, ওরা তুহিনের বাকি দুই ভাই ছিলো। মাঝেমধ্যে  ওর কোন বন্ধু ও হয়ত- 

আমি ছোট খাটো ধাক্কা খেলাম এইবার। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আমি কুকড়ে উঠছিলাম। সে না কীভাবে সহ্য করে এসেছে?

ও আবার সহজ গলায় বলে, 

- এইভাবে কখন কীভাবে আমি এইচ আই ভি পজেটিভ হয়ে গেলাম জানতেও পারলাম না। আর যারা যারা আমার সাথে -, 

একটু থামলো ও, 

-এইসব করতো, ওরা নিজেরাই বুঝতে পারে নি, ওরা এই রোগের মধ্যে যাচ্ছে।  

আমি নিজেও জানতাম না। তবে সবাই যখন একে একে অসুস্থ হতে শুরু করল তখন ওরা বুঝতে পারে। তবে আমার দোষ ও দিতে পারে না। কারণ তখন সবাই জিজ্ঞেস করবে আমার এইডস থাকে ওদের কীভাবে হলো? ওরা নোংরা চেহেরাটা সামনে আসতো। তাই ওরা এইসব চেপে গেল। ঠিকঠাক চিকিৎসা ও করায় নি। তাই একে একে সবাই মারা গেল। আর ওরা আমাকে আসামী বানিয়ে দিলো।  এই হচ্ছে ঘটনা। 

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কাগজে আরো কিছু শব্দ টুকে নিয়ে বললাম,

- তোমার বাচ্চার কথা আনলে না কেন তুমি তোমার এই গল্পে? যাকে তুমি নিজের হাতে খুন করেছিলে।

ও চমকে উঠলো, কারণ ও ভাবছিলো আমিও  সব  ডাক্তারের মতো ওর বানানো গল্প বিশ্বাস করছিলাম। 

-তুমি তোমার মেয়েকে কেন খুন করেছো? 

এইবার ওর চোখের পাতা অনবরত কেঁপে কেঁপে উঠছে। ও হয়ত মনে মনে কিছু ভাবছে কিংবা এমন কিছু ওর চোখের সামনে ভাসছে। যা ওকে কষ্ট দিচ্ছে। এক হাত অন্য হাতের সাথে ধরে আছে। 

এতক্ষন ওকে স্বাভাবিক লাগলেও এইবার ওকে অস্বাভাবিক লাগছে। 

আমি কিছুক্ষন সময় দিলাম ওকে। ওর দিকে তাকিয়ে আছি৷ ও যেন মূহুর্তে কেটে উঠলো দোটানাটা, পানির নিচ থেকে ডুব দিয়ে উঠল এমন ভাবে ফিরে তাকালো আমার দিকে। 

- আপনি আমার গল্প বিশ্বাস করছেন না তাই তো? 

- করছি তবে তোমার সত্যের সাথে মিথ্যা মেশানো গল্পটা আমার সত্য মনে হচ্ছে না। আমার ধারণা তুমি নিজের হাতেই সবাইকে খুন করেছো। নিজেকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে ভিক্টিম বানাচ্ছো। তুমি তোমার বাবাকেও খুন করেছো। তোমার মেয়েকেও। স্বামীকেও। যারা একটা খুন করার পর আরেক টা খুন করে ঠান্ডা মাথা তারা নিজেদের নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। কিছু কিলার নিজেদের অতি জ্ঞানী প্রমাণ করতে চায় তাদের গল্পে, কিছু কিলার নিজেকে ভিক্টিম বানাতে চায়। তুমি দ্বিতীয় শ্রেনীর। তুমি তোমার গল্পটাও সাজিয়েছো তিন স্তরে, যারা তোমার রূপে মুগ্ধ হবে তারা মোটেও তোমার এই গল্পে তোমাকে সন্দেহ করবে না। করুণা করবে। দ্বিতীয় যারা মিনিমাম সন্দেহ করবে তাদের জন্য কয়েক টা খটকা রেখেছো। আর যারা সত্যিই বুদ্ধিমান তারা সত্যের সাথে মেশানো মিথ্যা গুলো ধরতে পারবে। 

তুমি পুরোপুরি সত্য যেমন বলছো না। তেমনি পুরোপুরি মিথ্যাও বলছো না। তুমি মিথ্যার মাধ্যমে সত্য জানাতে চাইছো কিংবা সত্যের সাহায্য নিচ্ছো তোমার মিথ্যা ঢাকতে। 

সে আবার আলতো করে হাসলো, মাথাটা টেবিলে রাখলো। ছোট করে কাটা চুল গুলো সামনে এসে ছড়িয়ে আছে। আমি ওকে সময় দিচ্ছি। দেখতে চাচ্ছিলাম ওর পরর্বতী গল্প কীভাবে শোনায়। কারণ ওকে যত মিথ্যা বলতে দেওয়া হবে তত সত্য বের করা যাবে। 

অনেকক্ষন পর ও উঠছে দেখে। আমিই আবার কথা বললাম। ফাইল থেকে পরীর মতো দেখতে ওর মেয়ে অধরার ছবিটা বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম- 

-তোমার মেয়েও তোমার মতো সুন্দরী ছিলো তাই তো? 

এইবার ও মাথা তুলে তাকালো। টেবিল ওর মেয়ের ছবিটা দেখে ওর কান্না আটকানো চোখ টা চকচক করছে। আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। একটা ফোঁটাও পানি গড়িয়ে পড়ল না। চোখের কাজল গুলো যেন জলন্ত আগ্নেয়গিরি আটকে রেখেছে৷  

আমি আবার ছবিটা ফাইলে ঢুকিয়ে বললাম, 

-তোমার ধারণা ছিলো তোমার মেয়েও তোমার মায়ের মতো তোমার মতো আজীবন তার রূপের জন্য কষ্ট পাবে। তাই তুমি ওকে খুন করেছো। তাই তো? 

ও এইবার সোজা হয়ে বসলো। গলার স্বর টা অনেক টা কঠিন কিছুতে প্রতিধ্বনি হচ্ছে এমন শোনাচ্ছে।

- হ্যাঁ। কারণ আমার প্রায় মনে হতো আমাকে যদি মা না আনতো। কিংবা ছোটবেলায় গলা টিপে হত্যা করতো তাহলে নিজেকেই নিজের শত্রু মনে হতো না। জানেন না? ❝অপনা মাংসে হরিণা বৈরী❞ হরিণের মাংসেই হরিণের জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। 

অধরা হওয়ার পর থেকে আমার নির্ঘুমতা রোগ আবার ফিরে এলো। আমি সারাদিন রাত না ঘুমিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম।আশেপাশে কাউকে আসতে দিতাম না। এমন কি তুহিনকেও না। আমি মিনিট পাঁচেকের জন্য ওয়াশরুমে গেলে আমার মনে ওকে কেউ অত্যাচার করবে। একটু যখন বড় হলো, ওর সুন্দর চেহেরাটা সবার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। যেই আসতো ওকে আদর করতে চাইতো। কোলে নিতে চাইতো৷ আমি দিতাম না। রুমে ওকে নিয়ে বসে থাকতাম। সবাই আমাকে দোষ দিতে শুরু করে। অধরাও সবার কাছে যেতে চাইতো। যখন ওর বয়স চার বছর ওকে নিজের কাছে আর আটকে রাখতে পারতাম না। সবার কাছে যেতে চাইতো। 

-অস্বাভাবিক কিছু না। তখন বাচ্চারা চঞ্চল হয়। 

- তাই আমি ওকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতাম খাটের সাথে। 

কথাটা বলে থামলো ও। ওকে আমার এখন পুরোপুরি মানসিক রোগী মনে হচ্ছে৷ তবে এইটা নতুন না। বাইরের দেশের মায়েরা এই রোগে বেশি ভোগে। আমাদের দেশেও এখনো অনেক মা এই রোগে ভুগে। তবে তা নিজেরাই জানে না। তারা বাচ্চাদের জন্য ভীতিকর কিছু তাদের আশেপাশে আসতে দিতে চায় না। এইটা পোস্ট পার্টেম ডিপ্রেশনে ভয়াবহ স্টেজ। বাইরের দেশে অনেক মা এখনো বাচ্চাদের ডে কেয়ারে রাখতে চায় না। আমাদের দেশের মায়েরাও এইটা করে। নিজের সাথে হওয়া ভয় গুলো যাতে সন্তানের কাছে না আসে তার জন্য তাদের কোথায়ও যেতে দেয় না। আগলে রাখে। যে বাবারা নিজেরা ভালো পড়লেখার করতে না পারার কারণে বর্তমানে খারাপ অবস্থায় থাকে তারা ছেলেমেয়ে কে প্রচুর চাপ দেয় মনে করে এইটা ভালো হবে। এরা সন্তানের ক্ষতি চায় না তবে, ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সন্তানটায় হয়। আর বাবা মা কখনো নিজের দোষটা ধরতেই পারে না। তাই ওর মধ্যে অধরাকে খুন করার কোন আক্ষেপ নেই৷ কারণ ও ভাবছে ও মেয়েকে আজীবন কষ্ট পাওয়ার থেকে মুক্তি দিয়েছে। 

আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, তারপর? কেন মারলে ওকে? ওর সাথে কি এমন কিছু ঘটেছিলো যা নিয়ে তুমি ভয় পেতে? 

ও এইবার কথা বলছে না। যেন ভেতর উল্টে পাল্টে যাওয়া কোন বইয়ে তাক সে আনমনে গুছিয়ে ফেলছে। 

- একসময় সবাই মিলে আমাকে অধরার থেকে দূরে সড়িয়ে দেয়। আমাকে রুমে বন্ধ রাখতো ওরা ওকে নিয়ে খেলতো। 

-তারপর? 

-আমার চিন্তাটা আরো ভয়াবহ হতে শুরু করে। সারাক্ষণই অস্থিরতা। কিছু দিন পর ওকে স্কুলে দিতে সবাই উঠে পরে লাগে। চারিদিকে এত বাচ্চা ধর্ষনের খবর আমি রীতিমতো আঁতকে উঠতাম। কারো কোন শাস্তি হত না। মায়ের একটু একটু পরিশ্রমে গড়ে তোলা সন্তান কে ওরা দুই মিনিটে শেষ করে দিতো। এইসব চিন্তা আর নিতে পারছিলাম না। তাই একদিন ওকে বড় বালতি তে ডুবিয়ে- 

আমি আঁতকে উঠলাম। গ্লাস টা টেনে নিয়ে পানি খেলাম। গলা খাকিয়ে কোন মতে বললাম- 

- কে দেখলো এইটা? 

-কেউ না। 

-তবে আমি এরপর থেকে অধরা কে নিজের মত করে পেতে থাকি। একদম একা। শরীর নিয়ে ভয় নেই। শুধু আত্মা যেন আমার মেয়েই হয়েই আছে৷ এইটাই ভালো। 

-তুমি কি ওকে এখনো দেখতে পাচ্ছো? বার বার দেওয়ালে দিকে তাকাচ্ছো কেন? 

ও চমকে উঠলো না। কারণ ও হয়ত চাইছিলো আমি এমন কিছু বলি, ও নিজেকে রহস্যময়ী করে তুলতে চাচ্ছিলো। আশেপাশে মায়া ছড়িয়ে দিতে চাইছিলো। আমাকে ভাবতে বাধ্য করাতে চায় ওর সাথে ভৌতিক কিছু আছে। আমিও সেটা করতে ওকে সাহায্য করছিলাম। ও উত্তর দিচ্ছে না। নিজেকে আরো রহস্য জালে জড়াতে চায়। আমি আবার বলে উঠলাম-

- তুমি অন্য দের কীভাবে খুন করেছো একে একে বলো। কেনই বা খুন করেছো তোমার আশেপাশে যত পুরুষ ছিলো সবাইকে? 

এইবার ও উচ্চস্বরে হাসলো, ওর সামনের দিকে চলে আসা চুল গুলো পেছনে নিয়ে যেতে যেতে, চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল- 

- বললাম তো। আপনি বিশ্বাস না করলে আমি কি করব? 

- তুমি জানো আমি বিশ্বাস করি নি। কারণ অন্য সবার মতো আমি তোমাকে প্রশ্ন করি নি সবাই এইডসের কারণে মারা গেলে তুমি কীভাবে বেঁচে আছো? কারণ এইটার পেছনেও কোন ভৌতিক যুক্তি তুমি দেখাবে। 

আর সবার মৃত্যুর সময় এক ছিলো না। কারণ ও এক না। একেক জন কে একেক ভাবে খুন করেছো তুমি। সবটা সজ্ঞানে। তোমার গল্পটাতে অনেকটা সত্য ছিলো। অনেক টা মিথ্যা, 

-যেমন? 

 - আমার ধারণা তুমি নিজেই বিত্তের সাথে সেক্স করছিলে। তোমাদের প্রেম ছিলো। এখনো আছে। তাই সে বেঁচে আছে। 

বান্ধবীদের সাথে তুমি মদ খেয়েছিলে সাথে অন্য ছেলেরা ছিলো। তবে তুমি মাতাল হওয়ার পর তারা সেটার সুযোগ নিয়েছিলো। 

তোমার স্বামী আর তার অন্য ভাইয়েদের ব্যাপারটায় হয়ত কিছুটা সত্য আছে। বাকিটা আমি আঁচ করতে পারছি না এখন। 

ও তাচ্ছিল্যের স্বরে হেসে, হাত দুইটা লম্বা করে টেবিলে এগিয়ে দিয়ে থুতনি টা রাখলো। ওর চেহেরাটা এখন কোন দক্ষ হাতের শিল্পীর নিদারুণ সৃষ্টি মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে এখনিই পাথর খোদাই করে এই চেহেরাটা বের করে আনা হয়েছে। আমিও মুগ্ধ না হয়ে পারছি না। এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 

- তাহলে আপনিই বলুন আমি কীভাবে করেছি? 

- তাহলে তোমার বাবাকে দিয়েই শুরু করি? তোমার বাবাকে কি মায়ের মতো সেজে ভয় লাগিয়েছিলে? কিংবা এমন কিছু যা শুধু তোমার মা করতো তোমার বাবার সাথে? 

- তোমার বাবাকে তুমি খুন করেছিলে, তাই তো? 

ওর চেহেরাটা মোটেও কোন পরিবর্তন হলো না। মনে হচ্ছে ও যেন চাচ্ছিলো আমার চিন্তা ভাবনা সেদিকে ডাইভার্ট হোক। কিংবা ও আমাকে নিয়ে খেলতে চাইছে। কিংবা সে নিজের ইমোশন ভেতরে রাখতে জানে যেভাবে মেডিটেশনে শেখানো হয়। ও লম্বা সময় ধরেই মেডিটেশন করে বলে মনে হচ্ছে।  

- আপনার কেন মনে হলো আমি বাবার সাথে এমন কিছু করেছি? 

আমি উঠে হাই তুলতে তুলতে কফির মেশিনে দুইটা মগ বসিয়ে হাতে নিয়ে ফিরে এলাম টেবিলে। ফ্লোরে আমার হিলের কট কট আওয়াজ যেন অদ্ভুত নির্জনতার প্রকাশ করছে। 

ওর দিকে কফির মগ এগিয়ে দিয়ে বললাম, 

- কারণ তুমি অধরাকে তুহিনের কাছে দিতেও ভয় পেতে। মায়েরা আর যত ভয় করুক না কেন বাবার কাছে মেয়ে রাখতে ভয় পাওয়ার কথা না যদি না সে নিজে এমন কিছুর অভিজ্ঞতা না করে থাকে।  

চোখ বন্ধ করে কফির মগে চুমুক লাগালো। দুইহাতে ধরে আছে মগটা এখন। হাত দুটো চেয়ারে দুই হাতলে রেখে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল- 

- কিন্তু বাবার মৃত্যুর জন্য আমাকে কেউ কখনো সন্দেহ করে নি। আমি সে খুনের আসামী নয়। 

আমিও কফির মগ টা টেবিলে রেখে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম।  

-তাই তো তুমি নিজেকে অনেক বুদ্ধিমতি ভাবতে শুরু করেছো। অধরা মৃত্যুর জন্যেও তোমাকে দোষী ভাবা হয়েছিলো প্রায় ছয় মাস পর। তোমাকে তখন প্রথম জেলে দেওয়া হয়। তাই তো? 

-হ্যাঁ। আমাকে তখন প্রথম জেলে দেওয়া হয়, তবে কোন কিছুই প্রমাণ করা যায় নি। 

-তুমি অধরার সাথে কথা বলতে তা কি কেউ শুনে ফেলেছিলো? 

ও এক দৃষ্টিতে দেওয়ালের পাশ ঘেঁষে রাখা বড় কালো সোফাটার দিকে তাকিয়ে আছে। গত কাল এক বাচ্চা কে নিয়ে এসেছিল তার বাবা মা। তার ফেলে যাওয়া বাদামী টেডি বিয়ার এখনো সোফায় পরে আছে বাঁকা হয়ে। মুখ টা নিচের দিকে থেবরে আছে৷ ওটার দিকে তাকিয়ে আছে ও। আমিও তাকালাম। কারণ ওর দৃষ্টিটা টেডির উপর নয়, টেডির পাশে।  

-তোমার কি অধরা খুন করার জন্য কোন আক্ষেপ নেই? 

হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো ময়ূরাক্ষী, 

-না,  

ওর চিৎকারে আমিও ভয় পেয়ে গেলাম। তাও শান্ত গলায় বলায় বললাম, 

-কেন? 

- আমি ওকে নিজের করে পেয়েছি এখন । আমার মতো করে ওকে বড় করছি। এই দুনিয়ার সব নোংরা থেকে আলাদা ভাবে। 

- এতে কি ও খুশি আছে? হয়ত ওর জীবন টা তোমার চিন্তার মতো নাও হতো। সুন্দর হতো। 

ওর দৃষ্টিটা এখন বার বার সড়ে যাচ্ছে। ও এখন রেগে যাচ্ছে। আমি যেটা চাচ্ছিলাম। 

তবে আর বাড়ালাম না। কথা অন্য দিকে ফেরানো জন্য বললাম, 

-কে তোমাকে প্রথম অধরার খুনী ভেবেছিলো, তুহিন?  

ও এতক্ষনের মুখোশ টা খুলে যাচ্ছে, বেড়িয়ে আসছে ওর অস্থিরতা। বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। 

- আমি অধরার সাথে কথা বলতাম, ও আমার কাছে এসে হাটু গেড়ে বসে কান্না করতো। আমি ওকে বলতাম, ওর ভালোর জন্য আমি ওকে খুন করেছি। এইটা শুনেছিলো তুহিনের বাবা। উনিই কাজের মেয়েকে টাকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি করিয়েছিলো। মেয়েটা আমাকে অধরার মৃত্যুর দিন তুহিনের মায়ের রুম থেকে বের হতে দেখেছিলো, যেখানে অধরার বালতিতে ডুবে ছিলো। 

-তারপর? 

- পুলিশে দেওয়া হলো, তবে কাজের মেয়েটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি তাই কোন কিছু প্রমাণ হয় নি। আবার বাড়ি নিয়ে আসা হলো।

-তুমি ফিরে আসার সাত দিনের মাথায় তুহিনের বাবার আচমকা মৃত্যু হলো। কিন্তু কীভাবে? উনার খাবারের বা ওষুধে কি তুমি এমন কিছু দিয়েছিলে যার কারণে উনার মৃত্যু হলো? 

- পোস্টমার্টমে তেমন কিছু পাওয়া যায় নি। 

-তাহলেও কেন তোমাকে সে খুনেরও আসামী করা হলো? 

- সন্দেহ করে। আর কিছুই নেই। 

-তুমি কি খুন টা কর নি? 

- না, অধরা করেছিলো। 

এইবার আমি হাসলাম, কারণ আমি জানতাম ও আমাকে সেদিকে ডাইভার্ট করতে চাইবে।তাও বললাম- 

  -মানলাম অধরা করেছে। তবে উনার হার্ট অ্যাটাক হয় নি কিংবা কোন প্যানিক অ্যাটাক। যেটা তোমার বাবার হয়েছিলো কোন কিছু দেখে ভয় পেয়ে। 

আবার কিছুক্ষণ নীরবতা৷ অস্থির স্বরে ও বলল-

- মা মারা যাওয়ার পর যখন সবাই চলে যায় তখন প্রায়শ বাবা আমাকে রুমে এসে দেখে যেতো। আমার ভয় লাগতো। জেগে থাকতাম যেন - 

একটু থামলো ও, তারপর দুই হাতকে সমানে চেপে চেপে ধরছে ও, বলল-

- আমার বাবাকে ঘৃণা করতাম প্রতি স্পর্শ আমার কাছে জঘন্য ছিলো। মা মারা যাওয়ার কষ্ট আর এইভাবে রাতের পর রাত জেগে থাকার কারণে আমি নিজেকে আনসেইফ ভাবতে শুরু করি, তাই সেদিন বাবা যখন রুমে ঘুমাতে যায় আমি মায়ের নূপুর পরে মায়ের শাড়ি পরে বাবার রুমে গিয়ে বাবার পায়ের কাছে বসতেই বাবা আঁতকে উঠে, আবছা আলোতে আমার চেহেরাটা বাবার কাছে মায়ের মতো মনে হলো, 

বাবা চাপা স্বরে বলেছিলো, তুমি?  

আমি হ্যাঁ বলে উঠে দাঁড়াতেই বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়। আর-  

- তোমার কেন মনে হলো তুমি মায়ের মতো সাজলে তোমার বাবা ভয় পাবে। তুমি যতই বুদ্ধিমতি হও না কেন? বুদ্ধির পরিপক্কতা আসতে সময় লাগে। যেমন ছোট রা খেলনা দিয়ে আক্রমণ করে, এর একটু বড় রা কলম দিয়ে, এরপর যে যত যে জিনিস টা আশেপাশে থাকবে সে তা দিয়ে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। অত ছোট বয়েসে তোমার মাথায় এইটা কীভাবে এলো? 

আমার এই প্রশ্নে ও থমকে গেল৷ অন্য গল্পের মতো এইখানেও যে মিথ্যা আছে আমি ধরে ফেলেছি তাই। ওর গল্পে বাধা পড়লো। ওকে দ্রুত চিন্তা করতে হচ্ছে কি বলবে? 

ওকে চিন্তা করার সময় না দিয়ে আমি বললাম, 

- তুমি মায়ের মতো সেজেছিলে কারণ তুমি বাবার কাছে যেতে চাইছিলে, ভয় লাগাতে নয়। তবে তোমার বাবা ভয় পেয়ে গেল কারণ তুমি দেখতে একেবারেই তোমার মায়ের মতো। 

ওর অস্থিরতা আবার বেড়ে গেল। বিড়বিড় করে বলল- 

- মিথ্যা কথা, আমার এমন চিন্তা ছিলো না। 

-তুমি মিথ্যা কথা বলছো, যতোই কাছাকাছি রুম হোক এক রুমে শব্দ অন্য রুমে শোনা যাওয়ার কথা না। তুমি দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে বাবা মাকে অত্যাচার করছে। তোমার তখন কিশোরী বয়স, তাই- 

টেবিলে চাপড় দিয়ে ও উঠে দাঁড়িয়ে গেল। ওকে এখন অগ্নিমূর্তির মতো দেখাচ্ছে। আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে মুখ তুলে তাকালাম, হেসে বললাম, 

- তুমি তো সে খুনের আসামী নও, এত রাগার কোন কারণ নেই। শান্ত হয়ে বসো, ওটা ভুল বশত খুন ছিলো। পরের গুলোও কীভাবে করলে? 

ও আবার শান্ত হলো, ওর ভেতরে সত্ত্বা হয়ত ওকে জানান দিচ্ছে আমি ওকে রাগাতেই চাইছি। 

ও চেয়ারে বসে পড়তেই আমি আবার বললাম,তুহিনের বাবাকে কীভাবে খুন করলে, এত নিখুত ভাবে? কারণ কাজের মেয়েকে উনি হয়ত বানান নি সত্যিই কাজের মেয়েটা তোমাকে দেখেছিলো।

তুহিনের মৃত্যুও হয়েছিলো অজনা কারণে। হার্ট অ্যাটাক ও নয় কোন বিষ ও নয়। তুমি কি এমন করেছিলে যে তুহিন কে ও কোন প্রমাণ ছাড়া খুন করতে পেরেছিলে? 

ও চুপ করে রইলো। 

আমি আর কিছু বলতে যাবো তার আগেই ঘড়িতে দশটা বেজে উঠলো। দুইজন মহিলা পুলিশ ঢুকে বলল, 

-সময় শেষ ,  

আমি আরো রাখতে বললাম ওকে৷ কিন্তু ও নিজেই বসতে চাইলো না। বলল, 

-অপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগল, জেলার ম্যাম কে আবার আমাকে পাঠাতে বলবেন যাতে আবার দেখা হয় আপনার সাথে। বাকি খুনের গল্প ও শোনাবো। 

ও বের হয়ে যাচ্ছিলো। আমি ভীষণ রকম অস্থির হয়ে উঠলাম, কারণ ওর সাথে খেলতে আমারো ভালো লাগছিলো, 

 ও উঠে দাঁড়িয়ে, যাওয়ার আগে পানি গ্লাস টা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-

- পানির অনেক রূপ জানেন তো? তার একটা রূপ দিয়ে তুহিন কে খুন করেছিলাম। আর আরেক টা ওর বাবাকে। এখন আপনি বের করুন কীভাবে? 


- পানির অনেক রূপ জানেন তো? তার একটা রূপ দিয়ে তুহিন কে খুন করেছিলাম। আর আরেক টা ওর বাবাকে। এখন আপনি বের করুন কীভাবে? 

ও বেড়িয়ে যেতেই আমি অদ্ভুত দোটানায় পরে গেলাম। আমি বুঝতে পারছি না ঠিক কীভাবে এরপরে আমার ভাবা উচিত। 

আমার চেম্বারের জানালার গ্লাসে কুয়াশা জমেছে। তিনতলা থেকেও বাইরের রাস্তায় পুলিশের গাড়িটা চলে যাওয়া দেখা যাচ্ছে। আমি জানালা ঘেঁষে একপাশের পর্দা সড়িয়ে দেখছিলাম ওর যাওয়া টা৷ মনে হচ্ছে আমি ভালোই আটকে পড়েছি ওর মায়াজালে।

ওর গল্প আমার মস্তিষ্কে কত টা জায়গা করে নিয়েছে তা ও যাওয়ার পরে আমি টের পাচ্ছি। কারণ শেষের ছুড়ে দেওয়া প্রশ্ন টা ছাড়া আর কিছুই যেন ভাবতে পারছিলাম না। আমি আবার ওর ফাইল খুলে বসলাম, বিশাল ফাইল অনেক গুলো কেইসের ছোট্ট ডিটেইলস। 

তবে কোন কিছুতেই যেন স্থির হতে পারছিলাম না। বার বার পানি আর বরফ মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। 

 পানির আরেক রূপ বরফ, বরফ খাইয়ে মেরে ফেলার গল্প তো অনেক পড়েছি বিদেশী বইয়ের গল্পে। বরফ গলে পানি হয়ে যাবে কোন প্রমাণ থাকবে না। 

কিন্তু মাথা নাড়লাম, এইটা হয় বরফে ঢাকা পরিবেশে৷ যেখানে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে। যেখানে বরফ এমন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। 

অধরা কে মেরেছে বালতিতে ডুবিয়ে, তাহলে অন্যদের ও?  

না আর ভাবতে পারছিলাম না। 

রুমের মধ্যে পায়চারী করছিলাম, আনমনে হাটতে গিয়ে বার বার ধাক্কা খাচ্ছিলাম চেয়ারে। দুইবার ধাক্কা খাওয়ার পর সড়িয়ে রাখলাম চেয়ারে। 

তখন হঠাৎ একটা ব্যাপার মাথায় এলো, ও আমাকে একটা বাধা দিয়ে গেল যাতে আমি ওতেই বার বার ধাক্কা খেয়ে আটকে থাকি।ভাবলাম এইটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে। কিন্তু ওকে এইখানে পাঠানোর কারণ টা খালিদার থেকে আগে জেনে নেওয়া উচিত। 

খালিদাকে ফোন করলাম, রিসিভ করতেই তীব্র গালাগালির শব্দ শোনা যাচ্ছে। 

- হ্যালো মাহি? কিছু পেলে?  

- না তেমন কিছু না। যা পেয়েছি সব টা আমার অনুমানে সে সায় দিয়েছে কিছুটা। তবে আমার ওর পুরো গল্পটায় কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে।  

আমার মনে হচ্ছে পুরো কাহিনীটায় একটা রূপক গল্প, উদ্দেশ্য ও ভিন্ন। ও কিছু লুকানোর জন্য এইসব করছে। কিন্তু সেটা কি ধরতে পারছি না। ওর সব কথায় মিথ্যা মেশানো। এত সহজে বের করা যাবে বলে মনে হয় না। 

- হ্যাঁ খুব মিথ্যা বলে, এমন ভাবে বলে সব সত্য মনে হয়। আমার ওকে ভীষণ রহস্য ময়ী মনে হয়, না ও খুনের ব্যাপার গুলো স্বীকার করে। না অস্বীকার। বড় অদ্ভুত। এক পরিবারের এত গুলো মানুষের খুনের ব্যাপার বড্ড প্রেশার, বুঝলে? মেয়েটাকে টর্চার করলেও কিছু হয় না। না কোন চিৎকার করে না এক ফোঁটা পানি ফেলে, পনের বছরের ক্যারিয়ারে এমন কেইস আর পাই নি। 

-তোমার কেন মনে হলো ওর কাউন্সিলিং দরকার?  

- কারণ মেয়েটা স্বাভাবিক নয়, ওর মধ্যে কিছু তো আছে যা কেউ ধরতে পারে না। ওর সাথে যেই সেল মেট দেওয়া হোক না কেন তারা অদ্ভুত কারণে ওকে ভয় না। সেল চেঞ্জ করে ফেলতে চায়। তাই ভাবলাম তোমার কাছে পাঠায়। তুমিও তো পারছো না- 

- না না আমি পারবো, তুমি আর একবার পাঠাও ওকে।  

- কাল পরশুর মধ্যে তো সম্ভব না। 

- তাহলে কি আমি আসবো? ওখানে ঘন্টা দুয়েকের জন্য আমার ওর সাথে থাকার ব্যাবস্থা করে দিতে পারবে? 

- এইটা তো মুসকিল হবে, আচ্ছা তাও আমি ব্যবস্থা করছি।  

- আচ্ছা ওর উপর আরোপ করা সব খুনের পোস্টমার্টাম রিপোর্ট গুলো আমাকে পাঠাতে পারবে? 

- ওকে আমি ব্যবস্থা করছি। এক ঘন্টার মধ্যে পেয়ে যাবে। 

ফোন রাখতেই আমি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, আমার মনে হলো ওর সুন্দরী হওয়া যত টা ডার্ক সাইড আমাকে জানিয়েছে সে সেটার ঘনত্ব হইতো আমার চিন্তার বাইরে।  

ফাইল বের করলাম, লিখলাম ডার্ক সাইড অফ বিউটিফুল লেডি। 

বাড়ি ফিরেও সারারাত খালিদার পাঠানো কাগজ পত্র গুলো নিয়ে পড়ে রইলাম। যত দেখছিলাম তত যেন আরো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিলাম। 

সব এত স্বাভাবিক মৃত্যু। একবার দুইবার তিনবার পড়তে লাগলাম, কোন কিছু তো পাওয়া যাবে যা আমাকে এই রহস্য সমাধান করতে সাহায্য করবে। 

এখন রাত দুইটা, খালিদাকে আবার ফোন দিলাম, ঘুম ঘুম কন্ঠে ও বলল, 

- বেশী ভেবো না ওকে নিয়ে, ঘুমিয়ে পর। 

- আচ্ছা ওর মেয়ে অধরা মৃত্যু টা পানিতে ডুবার আগে হয়েছিল নাকি পানিতে ডুবার পরে হয়েছিলো। 

- কি বলতে চাইছো? কেউ মারার পরে পানিতে ফেলেছে ?  

- হ্যাঁ, এই সব মৃত্যুতে শুধু অধরার মৃত্যুর কারণ দেওয়া আছে। আর সেটা যতটা সহজ মনে হচ্ছে এত টা সহজ হয়ত না। 

- আমি কিছু বুঝতে পারছি না তোমার কথা, তোমার কি মনে হয় খুন গুলো ও করে নি? 

- সেটা এখনো বুঝতে পারছি না। চিন্তা কর তোমার পরিবারের কোন মানুষকে তুমি কারো খুনের জন্য জেলে পাঠালে, আবার তাকে ঘরে রাখলে। অন্যদের মারার সুযোগ করে দিলে। ব্যাপার টা এত টা স্বাভাবিক কীভাবে হতে পারে? আচ্ছা ওর কি আর কোন বাচ্চা আছে? 

- না, একটায় মেয়ে ছিলো। 

- ওর বিরুদ্ধে কেস করেছে কে? মানে ওকে জেলে পাঠিয়েছে কে? কারণ ওর পরিবারের সব ছেলেই তো মারা গিয়েছে। 

- ওর শ্বাশুড়ি। শুধু সে মহিলায় বেঁচে আছে। 

-আমি উনার সাথে দেখা করতে পারি? 

- উনি দেখা করবে কিনা আমি জানি না, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি, কেইস টা শেষ হোক আমিও চাই।

-তাহলে কাল সকালে আমি যাবো উনার সাথে দেখা করতে৷

খালিদা হাই তুলে ফোন রাখতে রাখতে আমি টেবিলে ছড়িয়ে রাখা কাগজ পত্র গুলো দিকে তাকিয়ে রইলাম ফাঁকা দৃষ্টিতে।  

পরের দিন সকালে খালিদার পাঠানো এক পুলিশের সাথে সেবাড়িতে গেলাম। বাড়িতেই যেতেই আমি ছোট্ট ধাক্কা খেলাম। এইটা বাড়ি নয়, রাজপ্রসাদ। 

বিশাল এলাকা জুড়ে ছবির মতো সাজানো বাড়ি। এতক্ষন ধরে আমি ভাবছিলাম কোন মধ্যবিত্ত বাড়ির বউ হয় ময়ূরাক্ষী। এত চাপ কেন ওকে নিয়ে খালিদার? 

এতক্ষনে বুঝতে পারলাম কেন এত চাপে আছে খালিদা, কেন সেও সব রকমের চেষ্টা করছে কেইস টা দ্রুত শেষ হোক। 

বসার রুমে বসে আছি অনেকক্ষন ধরে, এত চাকচিক্য আর দামী আসবাবে ভরা এই ঘর, কোন ঘর মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোন হোটলের রুম। 

কেমন যেন নিষ্প্রাণ সব কিছু। দুইদিকে বেয়ে উঠা সিঁড়ি যেন এইঘরে দাম্ভিকতা পরিচয় ধরে রেখেছে। 

সিঁড়ি দেওয়ালে টাঙ্গানো সোনালী ফ্রেমের বিশাল ছবি সবার গায়ে আভিজাত্য বোঝাই করা। একজন মহিলা কালো শাড়ি আর ডায়মন্ড এর দুলের সোফায় বসে আছে। বাকি তার তিনছেলে আর স্বামী কালো কোর্টে দাঁড়িয়ে।  

ছবিটা দেখতে উঠে সিঁড়ি কাছে চলে গিয়েছিলাম। পেছন থেকে ঝাঁঝালো একটা স্বরে ফিরলাম,  

- ছবিটা দেখে লাভ নেই ওরা কেউ বেঁচে নেই।

কলাপাতা রঙের পরিপাঠি শাড়ির সাথে সাদা ফুল হাতের ব্লাউস পরা এক মহিলা। বুঝতে অসুবিধা হয় নি উনিই ছবির সে রাজরানী। 

আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম, 

-আমি মাহাবুবা খানম, আমি একজন সাইক্রেটিস। আমি ময়ূরাক্ষীর কেইসের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।  

উনি আমাকে যেন হাত মেলানোর যোগ্য মনে করছেন না। কিংবা তিনি যে বিরক্ত তা বুঝাতে চাইছেন। 

সোফায় বসে আমাকে বিপরীতে রাখা সোফায় বসতে বললেন, 

ভদ্রমহিলাও অসম্ভব সুন্দরী, ময়ূরাক্ষীর চেয়ে বেশি সুন্দরী বলা যায়। 

আমরা সাধারণত বলি ছেলেটা একেবারে রাজপুত্রের মতো, রাজকন্যার মতো। রাজপুত্র বা রাজকন্যারা সুন্দর হয় কারণ রাজারা সেরা সেরা সুন্দরী দের বিয়ে করেন। তাই তাদের সন্তান ও সুন্দর হয়। ছবিতে থাকা তিনটি ছেলেকেই রাজপুত্র বলা যায়৷ এমন ছেলের জন্য ময়ূরাক্ষীর মতো মায়াবী মেয়েই খুঁজে আনবে এমন পরিবার সেটা বড্ড স্বাভাবিক ব্যাপার যেন। 

আমি কিছু বলার আগেই উনি নাক কুচকে অবজ্ঞা আর বিরক্তি মেশানো স্বরে বলে উঠলেন, 

- সে খুনী মেয়ের জন্য আবার সাইক্রেটিস?ধরে ফাঁসি না দিয়ে দেবে। 

- কিন্তু প্রমাণ তো নেই, মৃত্যু গুলোই খুব স্বাভাবিক।  

- আমি প্রমাণ, আমি বলছি তো সে মেয়ে খুনী। 

-কিন্তু সে খুন গুলো কীভাবে করেছে ?  

উনি চুপ হয়ে গেলেন, আমার এইভাবে প্রশ্ন করাতে যে উনি মোটেও খুশি না। তা ভ্রু কুচকে রাখা স্থির দৃষ্টিটা জানান দিচ্ছে। 

আমি আবার বললাম- 

- আমাকে সেটাই খুঁজে বের করতে বলেছে। খুন গুলো সে কীভাবে করেছে।

-তা পারলেন? 

- অনুমান করছি, তবে তার জন্য আপনার কাছে জানতে এসেছি, কেন আপনার ওকে খুনী মনে হলো। মৃত্যু গুলোতো স্বাভাবিক - 

আমি কথাটা শেষ করতে পারলাম না আলতার আগেই উনি চিৎকার করে উঠলো,

- এক সাথে একটার পর একটা মানুষ মারা গেলে এক ঘরে, আর আপনার মৃত্যু গুলো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে? ও ছাড়া আর কে বা করবে এইটা? 

- তারমানে আপনি বলতে চাচ্ছেন ওদের কে খুন করার যথেষ্ট মোটিভ ওর ছিলো, কিন্তু সেটা কি? 

আমার এই প্রশ্নে উনার এতক্ষনের দাম্ভিকতা ভরা চেহেরাটা কুকড়ে যাচ্ছে। হয়ত ভয় লুকাতেই রাগের আশ্রয় নিচ্ছেন। 

- আপনি জানেন আপনি কি বলতে চাইছেন? আপনার কি ধরনা ওকে কোন অত্যাচার করা হয়েছে, যার জন্য ও সবাইকে - 

- আমার ধারণা ওকে এই ঘরে অত্যাচারের চেয়েই বেশি কিছু ভোগ করতে হয়েছে, তাছাড়া- 

- যান, বেড়িয়ে যান- 

আমি কথাটা শেষ করার আগেই উনার এই ধরনের আচরণ আমার সন্দেহ টা আরো তীব্র করছে। আমি আরো বেপোয়োরা হয়ে উঠলাম আরো কিছু প্রশ্ন করার জন্য, উনি আমাকে সে সুযোগ না দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে যেতে বললেন, 

- এই কে আছিস, এই অসভ্য ডাক্তার টাকে এখান থেকে বের করে দেয়, আর যেন ত্রিসীমানায় আমি না দেখি। আমারেই ভুল হয়েছে সে মেয়েকে পুলিশে না দিয়ে আমারেই ওকে শাস্তি দেওয়া উচিত ছিলো। 

- যেভাবে অধরা কে দিয়েছেন সেভাবে?  

আমার কথায় উনার পা যেন থমকে গেল পা সিঁড়িতে পরার আগেই যেন ফসকে যেতে চাইলো। আমার দিকে ফিরে তাকালেন। আমি আমার ধারালো দৃষ্টি আর ধারালো প্রশ্ন গুলো আবারো শান দিতে লাগলাম।

অধরার ব্যাপারটা আমি অন্ধকারে ঢিল ছুড়েছি। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এই সব কিছুর শুরু অধরাকে ঘিরে। 

অধরার মৃত্যুটা যত সহজ দেখানো হচ্ছিলো ততটা সহজ না। আর যেটা জটিল করে দেখানো হচ্ছে সেটা আসলেই জটিল নয়। 

উনি এইবার কথা বলতে আটকে যাচ্ছেন। যেন নিজের দাম্ভিকতা ধরতে উনি আরো জোরে চেষ্টা করছেন।উনার ভেতরে ভেঙে যাওয়া মানুষ টা উনি কিছুতেই বের করে আনতে চাইছে না। 

উনার এই মূহুর্তের দোটানার সুযোগ নিয়ে আমি বলে উঠলাম, 

- আমি ময়ূরাক্ষীর রুম টা দেখতে চাই। 

- সে ঘরে কিছু নেই এমন- 

- কিছু পাবো কি পাবো না সেটা আমাকে দেখতে দিন, 

- আপনি বাড়াবাড়ি করছেন। 

- হয়ত আমার বাড়াবাড়িতে আপনি ওর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেতে পারেন। কারণ আপনার নিজের কাছেও ওর বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ নেই। 

আমার এমন কথায় উনি কিছুটা থিতু হলেন। 

অনিচ্ছা শর্তেও বললেন, 

-আসুন, ওদের রুম উপরে ছিলো৷ 

-ছিলো? 

আমিও যেন বিড়বিড় করতে করতে উঠে গেলাম। নিচের যত আভিজাত্য ভরা ছিলো উপরে তত টা সাধারণ। ঘরের কোণায় কোণায় কয়েক টা ফুলের টব আছে বিশাল দোতলা মিলে শুধু চারটা রুম। 

রুম গুলোও খুব বেশি চাকচিক্য ময় নয়। এতেই বোধহয় এই ঘরে সৌন্দর্য্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। 

আমি উপরের উঠে সব দিকে চোখ বুলাচ্ছিলাম। না কোথায় ও অধরা বা অন্য কারো ছবি নেই। শুধু উনার তিন ছেলের ছবি। কেউ তুষারে পাহাড়ে কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে, কেউ বিশাল সমুদ্রের জাহাজের উপর, কেউ এয়ার বেলুনে উড়ছে। উনার আর উনার স্বামী একটা অল্প বয়েসের ছবিও দেখা যাচ্ছে, জিন্স পরা ডুবাই তে। 

অবাক লাগছে অধরার কোন ছবি না দেখে। 

আমাকে ময়ূরাক্ষীর রুম টা খুলে দেওয়া হলো, 

আমি ভেতরে ডুকে সব টা দেখছিলাম ভীষণ সাধারণ যেন সব কিছু। এত সাধারণ লাগছে সব যেন কোন নাটকের স্টেজ। 

উনি দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম, 

-আমি কিছুতে হাত দেবো না। বা নিয়ে যাবো না। 

- মানুষ কে এক ঘরে থেকেও বিশ্বাস করতে পারলাম আজো আপনি তো অপরিচিত। 

কথাটা মিথ্যা নয় বলেই মনে হলো আমার। উনার দিকে তাকিয়ে বললাম, ময়ূরাক্ষী বা অধরার কোন ছবি দেখছি না যে,  

- সে খুনী মেয়ের ছবি আমি কেন রাখবো

 তাই সব ফেলে দিয়েছি। 

-আর অধরা? 

- ওর ছবি দেখলে সবার খারাপ লাগতো কষ্ট পেতো। ও নিজেও পাগলামী করতো তাই সব সড়িয়ে রাখা হয়েছে স্টোর রুমে আছে। ও নিজেই এইটা করেছে৷ 

আমি আর কথা বাড়ালাম না। বিশাল একটা বইয়ে থাক আছে এই রুমে। আমি হাত বুলিয়ে খুঁজতে লাগলাম কোথায় ও কোন ডায়েরী বা এমন কিছু আছে কিনা। না তেমন কিছু নেই। তবে বই গুলো একমনে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের দেশের মেয়েরা সাধারণত হুমায়ূনের বা সমরেশের গল্প গুলে খায়৷ কিন্তু ওর বইয়ের তাক ভিন্ন ভিন্ন রহস্য গল্পে ভরা। তাই বোধহয় ও এত রহস্য করে কথা বলতে পারে কিংবা এত মিথ্যা বলতে পারে।

তেমন কিছু পাচ্ছি না দেখে উনিও বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন,

-বলেছিলাম পাবেন না। 

- মানে আপনি আগে চেক করেছেন? 

কথাটা বলে আমি হাসার চেষ্টা করলাম, আমার প্রতিটা কথা যেন উনার বিরক্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

নিচে নেমে আসতেই, উনি এইবার নরম সুরে বললেন,

- মেয়েটা রাক্ষসীর আরেক রূপ! 

পেছন ফিরে বললাম, 

-এমন কোন যজ্ঞ আয়োজন কি এই ঘরে হতো যার জন্য ওকে রাক্ষসীর রূপ নিয়ে হয়েছে? 

উনি যেন আচ করতে পেরেছেন আমি কি ইঙ্গিত করছি। আমি ময়ূরাক্ষীর বলা সে গল্পটায় সত্যতা খুঁজছি যেখানে ওকে ঘুমের মধ্যে- 

- আমি জানি না আপনি বার বার এই কিসের কথা বলছেন, শুধু এইটা বলতে পারি ও স্বাভাবিক নয়, ও ঠান্ডা মাথায় সবাইকে খুন করতে পারে। 

- তাহলে আপনি বেঁচে গেলেন কি করে? 

- আমাকেই হয়ত ও শাস্তিটা দিতে চায় তাই, 

-আপনার পাপ টা কি ছিলো? 

উনি চমকে উঠলেন তবে ঘাবড়ে গেলেন না। ভেতরে চলে যাচ্ছিলেন। আবার বলে উঠলাম, 

- আমি সবার মৃত্যু টা একবার শুনতে চাই, 

থেমে যাওয়া পা যেন ভার নিতে পারছে না। উনি বসে পড়লেন আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। 

সোফায় বসে আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন,

- তুহিন, তুষার,তুরাগ আর ওদের বাবা চার জনেই বিছানায় স্বাভাবিক ভাবে শোয়া অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। কোথাও কোন ক্ষত ছিলো না। 

প্রতিবারেই বউমা ছাড়া আর কেউ ছিলো না ঘরে। আমি জানি না ও এইসব কীভাবে করেছে তবে আপনিই বলুন ওকে সন্দেহ না করার কি আছে? 

-অধরা ছাড়া আর একজনের খুনের চার্জ আছে ওর উপর, উনি কে? 

- আমাদের এই বাড়ির কাজের ছেলে জনি তবে অনেক টা ছেলেই বলা যায় ছোট বেলা থেকেই সে এই বাড়িতে। 

-ওর মৃত্যু? 

- বাথরুমে, জানি না কখন থেকে মরে পরে ছিলো, ডাক্তার বলেছিলো স্বাভাবিক মৃত্যু।  

- আপনার কেন মনে হলো এইসব খুন ময়ূরাক্ষী করেছে? 

উনি এইবার উত্তেজিত গলায় বলল, 

- ও নিজেই বলেছে আমাকে, সব খুন সে নিজে করেছে।

উনার কথায় আমি অনেক কিছু ক্লিয়ার হলেও আমার কেন যেন সব ধোয়াটে লাগছে। এইভাবে কোন প্রমাণ ছাড়া কীভাবে স্বাভাবিক মৃত্যুর মাধ্যমে খুন করা যায়? 

আমি স্টোর রুম টা দেখতে চাইলাম। অধরা অনেক ছবি, খেলনা, পুতুল, নানা রং এর বই। সব যেন একটা বক্সে বন্ধী। ওর স্মৃতির মতো। আমি সব কিছু খুটিয়ে দেখতে লাগলাম। একটা ড্রয়িং খাতা। অধরার কাঁচা হাতের কিছু ড্রয়িং। শেষের একটা ছবি দেখে আমি থমকে গেলাম। ছবিটা যেন নিশব্দে অনেক কিছু জানিয়ে দিলো আমাকে। 

ওখানে থেকে বেড়িয়ে আসতে, উনি বলে উঠলেন,

- ও মায়ারী, রাক্ষসী, ওর কালো যাদু জানে। 

-আমি এইসব মানি না। সব কিছু পেছনে একটা লজিক থাকে। সব খুনেরেও একটা মোটিভ থাকে। প্যাটার্ন থাকে। আর আমি খুঁজে বের করব। 

মেয়েটা আমার আরো রহস্যময়ী মনে হচ্ছে যতটা সে আমার কাছে নিজেকে রহস্যময়ী করে তুলেছিলো। তারচেয়েও বেশি রহস্য সে ধারণ করে রেখেছে ওর মাঝে যেন কোন প্রকৃতি সে। 

ওখান থেকে বের হয়ে আমি খালিদাকে ফোন দিলাম। 

বিশাল একটা সুতো যেন আমি পেয়ে গেলাম ময়ূরাক্ষীর যেটা দিয়ে ওকে আমি স্বীকার করাতে পারবো। 

দশ মিনিট হলো বসে আছি খালিদার নিয়ে আসা রুমে। 

দুইটা বড় লাইট জ্বলছে। তারমধ্যে একটা বার বা জ্বলছে আর নিভছে। এতে কেমন যেন ভুতুরে পরিবেশ তৈরী হচ্ছে। 

আমি অনেক গুলো প্রশ্ন সাজিয়ে নিয়ে এসেছি। মনে মনে ভাবছি আজেই বোধহয় আমার সব উত্তর পেয়ে যাবো ওর সব খুনের স্বীকারোক্তিও। 

খালিদা এই রুম টায় ক্যামেরা আছে বলে সে জানিয়েছে। সেও চায় দ্রুত শেষ হোক এই কেইস। মেয়েটার উপযুক্ত শাস্তি হোক। এমন মেয়ে নাকি একটা আতংকের নাম।

তবে আমার মোটেও ওকে কোন শাস্তি দেওয়া ইচ্ছে নেই। যেন আমি ওর মায়ায় পরেছি। তবে ও কি ঠান্ডা মাথার খুনী সে ভেবেই আবার আতকে উঠছি। কারণ যাই হোক না কেন খুন তো ও করেছে। 

কিছুক্ষন পর ওকে নিয়ে আসা হলো, আজ ওকে ভীষণ মলিন লাগছে, যেন ফুলের টবে লাগানো নিষ্প্রাণ সুন্দর ফুল। 

আমাকে দেখে আলতো করে হাসার চেষ্টা করলো। ওর গজ দাঁত টা বেড়িয়ে আসতেই আমার মধ্যে একটা মন খারাপ চেপে বসলো। সত্যিই ওর সুন্দরী হওয়াটায় ওর জীবনের অভিশাপ। 

- আমার গল্প আপনাকে এত টেনেছে আপনি নিজেই ছুটে এলেন আমার কাছে বাকি গল্প শুনতে?  

আমি হাসার চেষ্টা করলাম। 

- কি করবো? তুমি যে নিজেকেই মায়াবী করে তুলতে চাইছো।  

চেয়ার টেনে বসতে বসতে আরেক দফা হাসলো। নীল সাদা শাড়িতে ওকে করুণ দেখাচ্ছে। ওর শ্বশুর বাড়ি থেকে বের হয়ে ওর পরিবারের খোঁজ নিয়েছি। জানা গেল ওর বাবা আরো ধনী ছিলো। ওদের বাড়িটাও রাজপ্রাসাদেই ছিলো আর সবকিছু মালিক এখন শুধু ও। আমার তখনিই মনে হলো এই সব কিছুই ওর কাছে মেটার করে না। কারণ ওর বলা গল্পে ও মোটেও সে ব্যাপার গুলো আনতে চায় নি। যেন সূক্ষ্ম ভাবেই এড়িয়ে গেল। 

এমন একটা মেয়ের এমন অবস্থা সত্যিই মায়া হওয়ার কথা। 

- তো আজ কি শুনতে চান?  

- আজ আমি তোমার সাথে গল্প গল্প খেলতে আসি নি। তুমি সত্যিই অসাধারণ গল্প কথক। 

তবে আজ আমি সত্য শুনতে এসেছি। এসেছি আজ তোমার গল্প তোমাকে শোনাতে। তারপর তুমি সব স্বীকারোক্তি দেবে। 

এইবার উচ্চস্বরেই হেসে উঠলো, 

- এতে আমার লাভ? বরং ক্ষতিই হবে। আমার ফাঁসি হবে। কিংবা আজীবন জেল। 

-তা তো এখনো হচ্ছে। কারণ কেউ তোমাকে বের করতে আসছে। তারচেয়ে ভালো আমি তোমাকে একটা সুযোগ দেব, সেটা আমি পরে জানাচ্ছি। 

ওর মনের ভেতর চলা প্রশ্ন গুলো চোখে মুখে ফুটে উঠতে চাইছে৷ তবে সে প্রকাশ করছে না। 

ওর জন্য রাখা চা টা টেনে নিয়ে বলল,

-তাহলে শুরু করুন। 

চা খাওয়ার পর বলল, 

- বাহ, আপনার চেম্বারের চা টা, আমার জন্য নিয়ে এলেন বুঝি? 

- হ্যাঁ। তোমার পছন্দ হয়েছিলো। 

- এইখানে আসার পর এই প্রথম কেউ আমার জন্য কিছু আনলো। 

কথাটা বলে আবার চায়ের কাপ তুলে দিলো মুখে, কিছুক্ষন ধরে রাখলো। আমার মনে হলো ও চোখের পানি আটকানো চেষ্টা করছে। আমি সেদিনে নজর দিলাম না। সৃষ্টিকর্তা আমাদের মেয়েদের অদ্ভুত সব কারণেও চোখের পানি আটকাতে না পারার ক্ষমতা দিয়েছেন। আমি নিচু হয়ে ব্যাগ থেকে কিছু কাগজ পত্র বের করলাম। সে সুযোগে ও হয়ত কান্না টা গিলে ফেলেছে। 

অনেক টা স্বাভাবিক লাগছে ওকে এইবার।  

আমি ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলাম, 

- তোমার গল্পটা আমি শুরু করি তোমার দুইজন প্রিয় মানুষের একজনের মৃত্যু দিয়ে। 

একহাতে ঘাড়ে একপাশে ধরে মাথা বাঁকা করে আমার দিকে তাকালো, যেন আমার কথাটা ওকে আগ্রহী করে তুলেছে। 

- তোমার মায়ের মৃত্যুটা তোমার কাছে প্রথম ধাক্কা ছিলো। তখন হয়ত তোমার কাছে মা ছাড়া আর কেউ আপণ ছিলো না। 

তোমার মায়ের আত্মহত্যা টা তোমার কাছে একটা স্বার্থপরতা মনে হলো। কারণ তোমার মা জানতো তোমার বাবার স্বভাব তাও তোমাকে রক্ষার জন্য না থেকে উনি চলে গেলেন। তুমি ভয় পেতে শুরু করলে। কিন্তু ভেবে নিয়েছিলে তুমি তোমার বাবাকে খুন করবে। তোমার বাবাকে ভীষণ চালক মানুষ ছিলো তাই তার এত সম্পত্তি ছিলো। উনাকে মারা সহজ হবে না। তাই তুমি তোমার মায়ের মতো সেজে বাবার কাছে গেলে যাতে উনি তোমার প্রতি আগ্রহী হয় এবং তুমি উনাকে খুন করতে পারো।  

একটু শব্দ করেই হেসে উঠলো ও, হাত গুলো নিচের দিকে নামিয়ে মোচর দিতে দিতে বলল, 

- হ্যাঁ আমি কম্পাসের কাঁটা নিয়ে গিয়েছিলাম বাবাকে খুন করতে। কারণ আমার মনে হতো বাবা মাকে খুন করেছে আর সেটা আত্মহত্যা বলে জানে সবাই। 

কিন্তু বাবার ঘুমের ঘোরে ভেবেছে আমি মা, আর তাকে খুন করতে এসেছি। দ্রুত হার্টবিট বেড়ে গিয়ে হার্ট এট্যাক করলো।  

তখন আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। কি করব বুঝতে পারলাম না। আমি তাড়াতাড়ি বাবাকে আবার স্বাভাবিক করে শুইয়ে দিলাম। তারপর বের হয়ে গেলাম। 

- হ্যাঁ। এরপরের গল্প তুমি যা বলেছো আমি মেনে নিলাম। সত্য মিথ্যা মিশিয়ে। তুমি প্রতিনিয়ত তোমার রূপের জন্য কষ্ট পেতে। কিন্তু তুমি জানতে তোমার রূপেই তোমার প্রধান অস্ত্র। তাই যখন কেউ এইভাবে তোমাকে স্পর্শ করতে আসতো তুমি প্রতিবারেই ভয়ংকর হয়ে উঠতে। 

-হ্যাঁ। আমি জানতাম আমাকে বাঁচাতে কেউ আসবে না। সবাই আমাকেই দোষ দেবে। 

- তখন তুমি ওদের সাথে সায় দিতে সুযোগ বুঝে ওদের সাথে এমন কিছু করতে। যাতে ওরা তোমাকে ভয় পেত। তুমি দেখতে যতটা নরম ততটা শক্ত মনের।  

- হ্যাঁ আমি তাদের অন্ডকোষ চেপে ধরে মুখে বরফ ঢুকিয়ে দিতাম। যখন প্রচন্ড যন্ত্রনা পেতো তখন আমি ছেড়ে দিতাম। আর

এইটাই ওদের জন্য উপযুক্ত শাস্তি ছিলো। 

- হয়ত, এইভাবে কয় জনের সাথে করেছিলে? 

- চারজন! 

ওর এই র্নিলিপ্ত কথা গুলো যেন ওকে ভয়ংকর খুনীই মনে হচ্ছিলো। 


-চলবে।

Upcoming Next Part..Just wating few Day...








No comments

Powered by Blogger.