ডার্ক সাইড অফ এ বিউটিফুল লেডি - দোলনা বড়ুয়া তৃষা, পর্ব - ০৭ ও শেষ পর্ব
ডার্ক সাইড অফ এ বিউটিফুল লেডি
পর্ব_ ০৭,০৮ শেষ পর্ব
দোলনা বড়ুয়া তৃষা
আমি আবার গলা খাকারিয়ে বললাম,
- তুহিনের সাথে তোমার বিয়েটা তোমার পছন্দেই হয়েছিলো। তুমি ভেবেছিলে ভালো থাকবে সে বিশাল ঘরে। কিন্তু সেখানেও তোমার রূপ তোমার কাল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
ও একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন আমার পরের কথা শোনার অপেক্ষায় আছে ও।
আমি চুপ থেকে বললাম, সে ঘরে আর যা কিছু অভাব না থাকলেও মেয়েদের সম্মানের খুব অভাব। তাই তো?
- হ্যাঁ, সে ঘরে মেয়ে মানেই শুধু কোন খেলনার বস্তু। বিছানা ছাড়া আর কোথাও যেন তারা জীবন্ত নয়। দামী কোন আসবাবপত্র শুধু।
- তাহলে তুমি বেরিয়ে আসতে৷ ডির্ভোস দিতে। তোমার নিজের নামেও অনেক সম্পত্তি ছিলো। তুমি যথেষ্ট ক্ষমতাবান মেয়ে।
- যত টা সহজ ভাবছেন হয়ত অতটা সহজ ছিলো না ব্যাপার টা।
- কারণ ওদের কাছে তোমার মাতাল অবস্থায় তোলা ভিডিও ছিলো। এইতো?
ওর হাত পা কাঁপছে । আমি খালিদার দিকে তাকালাম। ও বাইরে থেকে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। ও যেন কুঁকড়ে উঠছে।
-এই কথা আপনার কেন মনে হলো?
- কারণ তুমি বলেছিলে ঘুমের মধ্যে অন্য কেউ তোমাকে স্পর্শ করতো, স্বাভাবিক ঘুমের মধ্যে হলে তুমি জেগে উঠতে পারতে। কিন্তু তুমি জেগে উঠে প্রতিবাদ করতে পারতে না। যেটা সেদিন সূক্ষ্ম ভাবে এড়িয়ে গিয়েছো তুমি। কারণ তখন হয়ত তুমি মাতাল থাকতে।
তোমাদের ঘরে বিশাল বিশাল পার্টিতে তোমার মদ খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। তুমি এখন যতটা শান্ত। ততটা শান্ত তুমি ছিলে না। তোমার লাইফস্টাইল ছিলো যথেষ্ট খারাপ। এমন কি তুমি ড্রাগস ও নিতে। তাই তুমি অনেক কিছুই জানতে ড্রাগসের সর্ম্পকে।
অস্থির গলায় বলল-
-এইসব আপনাকে কে বলল?
- তোমার সম্পর্কে খোঁজ যে নিয়ে এসেছি তা হয়ত তুমি বুঝতে পারছো।
ও এইবার চুপ করে রইলো।আমি আর কিছু বলছি না। কারণ বাকি কথা ওকেই বলতে হবে। না হলে প্রমাণ করা যাবে না কিছুই।
ও এইবার চিৎকার করে উঠল,
- হ্যাঁ আমার ড্রাগস নেওয়ার অভ্যাস ছিলো। কিন্তু সেটার সুযোগ যে সবাই নিতে পারবে তার অধিকার তো আমি কাউকে দিইনি।
ওরা আমাকে ব্যবহার করতো। বড় বড় ডিলের জন্য। ওরা আমাকে ব্যবহার করতো ওদের অন্যায়গুলো ঢাকতে, সাহায্য নেওয়া বড় বড় মন্ত্রীদের শান্ত রাখতে। সে ঘরের প্রতিটা ছেলেই ছিলো নোংরা চরিত্রের। আর সবাই জেনে তা চুপচাপ সহ্য করেছিলো। যেন এইসব অতি সামান্য ব্যাপার।
ওর গলার স্বর টা অদ্ভুত শোনাচ্ছে। যেন ভেজা মাটিতে আটকে আছে ওর স্বরটা।
খালিদা আবার কুঁকড়ে উঠলো।মেয়েদের এই ধরনের অত্যাচার ও মোটেও সহ্য করতে পারে না৷ কলেজ লাইফ থেকে তাই ও পুলিশে এসেছে।
- তারপর? অধরা হওয়াতে ওদের সে সুযোগে বাঁধা পড়লো?
দুইহাতের তালু দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলল, স্বর টা দ্রুত চেইঞ্জ হয়ে গেল। বলল-
- হ্যাঁ। তাই ওরা কেউই অধরাকে পছন্দ করতো না। তাছাড়া মেয়ে হওয়াটাও ওদের পছন্দ না। ছেলে হলে ওদের হতো। মেয়ে হওয়াতে ও শুধু আমার মেয়ে হয়েই রয়ে গেল। আমি ওকে নিয়ে সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতাম। আমি ড্রাগস নেওয়া ছেড়ে দিলাম। তখনিই আমি বুঝতে পারি ওরা কতটা নোংরা মনের।
- কিন্তু অধরাকে খুন করলে কেন? যে গল্পটা বলেছিলে সেটা কি সত্য?
ও এইবার চুপ হয়ে গেল। হয়ত ও নিজেই বুঝতে পারছেনা কি বলবে এখন।
- তুমি কি সত্যিই অধরাকে খুন করেছিলে? নাকি ওরা খুন করে তোমার উপর দোষ চাপিয়েছিলো?
এই প্রথম ওর চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো। খালিদা অস্থির হয়ে উঠেছে। যেন ও বিশ্বাসই করতে পারছে না।
- তোমাকে কিসের জন্য এই শাস্তি দেওয়া হয়েছিলো?
কোন শব্দেই যেন ওর ভেতরে চলা তুফানটা সরিয়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না। ও অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে আছে দেখে খালিদা রুমে ঢুকে বলে উঠলো,
- তোমার সাথে যদি কোন অন্যায় হয়ে থাকে তার শাস্তিও তারা পাবে। তুমি নির্দ্ধিধায় বলো। তোমার কোন দোষ না থাকলে তোমার মুক্তির ব্যবস্থা আমি করব।
ও এইবার চোখ তুলে তাকালো, বলল,
- হ্যাঁ অধরাকে ওরাই খুন করেছিলো।
আমি আর খালেদা চোখাচোখি হলাম, ও বলতে শুরু করল,
- সেদিন তুহিন আমাকে খুব জোর করছিলো পার্টিতে নিয়ে যাওয়া জন্য৷ আমি রেডি হচ্ছি না দেখে খুব চিৎকার চেচামেচি শুরু করল। এই শুনে ওর মা আর দুই ভাই সবাই এসে আমাকে শাসাতে লাগল, বলল -
-আমি না গেলে ওরা অধরাকে অত্যাচার করবে, আমি যাচ্ছিলাম না তাও। ওরা আমার সামনেই অধরাকে বার বার বালতিতে ডুবাতে থাকে।
তারপর, একসময় নাকে মুখে পানি গিয়ে নিশ্বাস আটকে যায় অধরার, আমাকে ভয় লাগাতে গিয়ে ওরা আমার অধরাকে মেরেই ফেলে৷
বলতে বলতে ও ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমারো চোখের কোণে পানি জমল। খালিদাও যেন থমকে গেল। হয়ত কত মানুষের মৃত্যু দেখে ও কিন্তু এমন নির্মম হত্যাতে নির্বাক হচ্ছে সেও।
-এরপর ওকে বালতিতে ফেলে রাখা হয়। এক্সিডেন্ট দেখানো হয়। এরপরও যখন আমি বেপরোয়া হয়ে উঠলাম তখন ওরা আমাকে আমার মেয়ের খুনী বানিয়ে দেয়। কাজের মেয়েকে টাকা দিয়ে ওরা সাক্ষী বানায়।
দুইহাতে মুখ ঢেকে ফেলল ও।
এতক্ষনের ইমোশনাল গল্প শোনার পরও আমার মস্তিস্ক আবার বলছে, এইবার আমার ওকে প্রশ্ন করার পালা।
আমি চেয়ার টেনে আরেকটু সামনে গিয়ে বসলাম,
- সে কাজের মেয়েকে কে সরিয়েছিলো?
-ওরাই, ওরা শুধু আমাকে ভয় লাগাতে চেয়েছিলো।
- মিথ্যা।
ও এইবার চোখ তুলে তাকালো, আমি আবার বললাম,
- সে বাড়ির কাজের ছেলে জনি তোমাকে সাহায্য করতো। তাই তো?
ওর চোখ গুলো যেন আবার দ্রুত নড়ছে, বার বার এইদিক ওদিক করছে৷ সত্য মিথ্যা মেশানো গল্পে ও নিজেই যেন আটকে পড়ছে।
বললাম, সত্যটা বলো।
- হ্যাঁ, সে কাজের মেয়েটাকে খুন করেছিলো জনি। আমাকে বাঁচাতে। ওরাও ভাবলো এই সুযোগে ভয় দেখিয়ে আবার আমাকে দিয়ে -
থেমে গেল ও, আমি ওকে সময় দিচ্ছি। ওর মধ্যে অদ্ভুত দোটানা চলছে। দেখাতে চাইছে না তাও যেন বেরিয়ে আসছে। খালিদা আলতো করে বলল-
-তারপর?
আমিও বলে উঠলাম, তুমি আমাকে বলেছিলে, পানির রূপ দিয়ে তুমি ওদের খুন করেছিলে সেটা কীভাবে?
নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে ও। বলল-
- আমি চুপচাপ হয়ে গেলাম, আমি সে মহিলার কাছ থেকে তার সব প্রিয় মানুষ ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিলাম, যে আমার কাছ থেকে আমার প্রিয় মানুষ ছিনিয়ে নিয়েছে।
তাই আমি একে একে সবাইকে খুন করেছি জনির সাথে মিলে।
-কীভাবে?
-আমি বাড়ি ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষা করতাম। যখন বাড়িতে যাকে পেয়েছি। তাকে খুন করতাম। প্রথমে করেছিলাম তুহিনের বাবাকে।
সেদিন বাড়িতে কেউ ছিলো না, সে সুযোগে উনি আমাকে ডাকেন উনার মদের গ্লাস আর বরফ দিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি গেলাম,
-আর তুমি জানতে কীভাবে সব পুরুষদের আর্কষণ করতে হয়।
- আমার তেমন কিছু করতে হতো না, শুধু আঁচল নিচু হলেই সবাই ধরে নিতো -
- তারপর?
- সুযোগ বুঝে জনি এসে পেছন থেকে হাত চেপে ধরে, তারপর জনি উনাকে বাথরুমে নিয়ে যায়। বিশাল বাথরুমে তাকে চিৎ করে ফেলতাম। আমি গায়ের উপর চড়ে বসতাম, তারপর আমার সুতির শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলত জনি।
নাক বরাবর সরু ধারায় পানি ফেলতাম, সুতির কাপড়ের কারণে অক্সিজেন এমনিতে আটকে যেত, তার উপর সরু ধারায় ফেলা পানি দ্রুত অক্সিজেনের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতো। এইভাবে মিনিট দুয়েকের মধ্যে মারা যায় মানুষ।
খুনের এমন অভিনব কৌশল শুনে আমি আঁতকে উঠলাম। সাথে খালিদাও।
এরপর জনি সব কাপড়চোপড় দ্রুত চেঞ্জ করে আবার বিছানায় শুইয়ে দেয়। জনির সব ঘরে যাওয়ার আর সবার কাপড় চোপড় ধোয়ার পারমিশন ছিলো।
তাই কারো মনে সন্দেহ আসতো না।
যতক্ষণে সবাই জানতে পারত আর পোস্টমর্টাম হতো ততক্ষণে শুধু নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়াটাই কারণ থাকতো।
খালিদা এইবার আমার দিকে তাকালো ও যেন বলতে চাইছে -- এই মেয়ে ভয়ংকর!
আমি কেন যেন মানতে পারছিলাম না।
- তারপর?
- তুহিনের দুই ভাই কেও, বাসায় কেউ না থাকলে তখন দেখা করার ইঙ্গিত দিতাম, তারা নিজেরাই রচনা করত তাদের মৃত্যু।
আমি আর জনি মিলে একই ভাবে ওদেরও মুখের উপর সুতির কাপড় দিয়ে নাক বরাবর পানি দিয়ে -
আমি বলে উঠলাম, এই ধরনের টর্চার কে বলা হয় waterboarding । আর্মিদের মধ্যে এই ধরনের টর্চার চালু ছিলো, এরপর একটা সময়ের পর এইটাকে লিগ্যালি ব্যান করে দেওয়া হয়।
খালিদা বলে উঠল,
- আমাদের পুলিশ টর্চারে একটা আছে যেটা তে কপালের উপর অনবরত বিন্দু বিন্দু পানি টর্চার করা হয়। এইটা দীর্ঘ সময় ধরে
করলে -
খালিদা কথাটা শেষ করার আগে ময়ূরাক্ষী আবার বলে উঠলো,
- আর সে টর্চারটা যদি বরফ দিয়ে করা হয়?
আজ রাতে শেষ পর্ব পেয়ে যাবে।
আমি আর খালিদা আবার ফিরে তাকালাম ময়ূরাক্ষীর দিকে।
ময়ূরাক্ষী টেবিলে রাখা ওর কেইসের ফাইলগুলো থেকে একটা কাগজ টেনে নিয়ে খেলনার মতো কিছু বানাতে বানাতে নির্লিপ্ত গলায় বলল-
- আর টর্চার টা যদি বরফ দিয়ে হয়, তখন মানুষের মৃত্যু হয়।
- তুমি তুহিন কে কি এইভাবে খুন করেছিলে?
কাগজের প্লেন বানিয়ে ও উড়িয়ে দিলো। সেটা উড়ে গিয়ে দ্রুত দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
- আমি তুহিন কে ভালোবেসে ছিলাম। আশ্রয় নিয়েছিলাম। ওর সন্তানের মা হয়েছি। ওর উচিত ছিলো আমাদের রক্ষা করা। আমাকে নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়া। তবে ও সেটা না করে আমাকে ইউজ করতে লাগলো, টর্চার করতে লাগল। ওর সামনে অধরাকে ওরা খুন করে ফেলল আর ও কিছুই বললো না। উল্টা আমাকে খুনের দায়ে জেলে পাঠালো?
ওর ভীষণ ওয়াইল্ড সেক্সের শখ ছিলো। হাত পা বেঁধে। সেদিন ও প্রথমে আমাকে বাঁধলো। আমি সেদিন ওকে সবচেয়ে বেশি সুখ দিয়েছিলাম।
All men's brain stop when they are highest point of sex.
আমিও সে সুযোগ নিলাম। আমি ওকে বাঁধলাম।
আবার থামলো ও। আমার আর খালিদার দুজনেরেই হার্টবিট যেন এখনি থমকে যাবে। ওর প্রতিটা কথা বলার থামার মূহুর্তে।
- আমি আমার সুতির শাড়ির আঁচল আবার ব্যবহার করলাম। অনেক গুলো বরফের কিউব একসাথে বেধে বসিয়ে দিলাম ওর পুরো মুখের উপর। ফেলে রাখলাম সেভাবে আট ঘন্টার জন্য। আমি ওকে কষ্ট দিয়ে মারতে চেয়েছিলাম। এবং আমি তা করেছি।
একই ভাবে কাপড়ের কারণে অক্সিজেন সাপ্লাই কমে যায় আর বরফের কারণে ওর ব্রেইন কাজ করা বন্ধ করে দেয়৷ নিশ্বাস ও আটকে যায়।
পরের কাজ গুলো সিম্পল ছিলো। সন্দেহ করার মতো না।
আমার গলা শুকিয়ে আসছে৷ হঠাৎ আমাকে ওর বুক সেলফটা ভাবাতে লাগলো, যেখানে waterboarding এর অত্যাচার সম্পর্কিত অনেক গুলো গল্পের বই ছিলো।
খালিদা একেবারেই চুপ হয়ে গেল। আমি আবার গলা খাকরিয়ে বললাম,
-তাহলে জনিকে কেন মারলে?
-জনি আমাকে ব্যবহার করতো। আমিও জনি কে। আমার অস্ত্র ছিলো রূপ। সে জালে সবাই যেন নিজেই ধরা দিতে আসতো।
কথাটা বলে ও আবার আলতো করে হাসলো ওর গজ দাঁত বেরিয়ে এলো। আবার বলল
-কিন্তু তুহিনের মৃত্যুর পর ও আমার উপর অধিকার দাবী করতে চাইলো।
আমাকে বিয়ে করতে চাইতো। আমি বলতাম,তাহলে এইখান থেকে পালিয়ে যাই? না ওর আমার সব সম্পত্তিও লাগবে। ও আমাকে হুমকি দিতে লাগলো সব খুনের জন্য।
-তাই ওকে ও এইভাবে খুন করলে?
- হ্যাঁ। ওর সাথে আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম হঠাৎ তুহিনের মা ডাক দেওয়ায় আমরা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলাম। কাছাকাছি আসাতে ওর আমাকে পাওয়ার ইচ্ছে জেগে উঠলো। আমিও সায় দিলাম। ও যখন বিভোর হচ্ছিলো তখন আমি ওর হাত বাঁধছিলাম। ও ওয়াইল্ড কিছু হবে এই আশায় খুশি হচ্ছিলো। তখন আমি ওকে ধাক্কা দিয়ে ফ্লোরে ফেলে দিই। সরু ধারায় পানির কল ছেড়ে দিই মুখের উপর আমার উড়না ফেলে। এরপর ওর পা উঁচিয়ে ধরি। কিছুক্ষনের মধ্যে ওর নিশ্বাসও বন্ধ হয়ে যায়। আমি ওর সব কাপড় ঠিক করে রেখে ওখান থেকে বেরিয়ে আসি।
আমি বললাম,
-এইটাও waterboarding এর একটা পদ্ধতি,
খালিদা বলল,
- তারপর?
- তারপর আর কি? সবাইকে হারিয়ে তুহিনের মায়ের অবস্থা দেখে আমার করুণা হতো।
-উনাকে মারলে না কেন?
- তাহলে কষ্টটা কে পেতো আমার মতো সন্তান হারানোর?
ওর এই কথাটা যেন চিৎকার করে বলছে কতটা ঘৃণা পুষে রেখেছে সে পরিবারের জন্য। আর কোন অক্ষেপ জমা নেই ওদের খুন করে। কতটা আত্মবিশ্বাস ও নিজের প্রতিটা খুনে।ওর সিদ্ধান্তের উপরে।
খালিদা ওর প্রমাণ পেয়ে গেল তবে ওরও আমার মতো মন খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা সত্যিই মায়াবী।
খালিদা কথা দিলো ময়ূরাক্ষীর শাশুড়ী কে তার অপরাধের শাস্তি দেবে। আর ওর শাস্তি কমাবে।
ওকে আবার দুইজন পুলিশ মিলে নিয়ে যাচ্ছিলো। তখন আমি বললাম-
- তোমাকে একটা সুযোগ দেব বলেছিলাম। আমি তোমার জন্য একটা সুযোগ এনেছি।তোমার জন্য আমি শুধু চা নয়, আরো প্রিয় কিছু এনেছি। তোমার জন্য অধরাকে নিয়ে এসেছি।
ও যেন থমকে গেল। খালিদাও আমার দিকে ফিরে তাকালো।
আমি ফোন দেওয়াতে আমার সহকারী শাহেলা ছয় বছরের একটা মেয়েকে নিয়ে এলো।
ওকে দেখে ময়ূরাক্ষী মাটিতে বসে পড়লো।
মেয়েটা হাতে একটা পুতুল। লম্বা চুলের ডান পাশে একটা লাল ক্লিপ।
ময়ূরাক্ষীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে ওর গায়ে হাত রাখতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
খালিদা আমার দিকে তাকিয়ে রইলো,
- তোমার জমজ মেয়ে হয়েছিলো। তুমি জানতে সে ঘরে মেয়ে মানা হবে না। তাও দুজন কে। তুমি অধরাকে কাছে রেখে অন্য মেয়েকে দূরে একটা ঘরে রেখেছিলে। যেটার দেখাশোনা বিত্ত করতো। যে তোমার মামাতো ভাই।
আমি তোমার কথা জানতে তার কাছেও গিয়েছিলাম। তোমার একাউন্ট থেকে মোটা অংকের টাকা যেত ওর কাছে। তোমার সব খুনের সাথে সেও জড়িত এমন অভিযোগ করাতে সে আমাকে এই অধরার কথা জানিয়ে দেয়।
আমি জানি মায়েরা সন্তানের মৃত্যুতে কতটা কষ্ট পেয়ে ঠান্ডা মাথার খুনী হতে পারে। আর কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠে অন্য সন্তানকে রক্ষা করতে।
দুইটা একসাথে করতে গিয়ে তুমি এমন খুনী হয়েছো।
মেয়েটা কিছুই বুঝতে পারছে না। আমি ওকে বলেছিলাম আজ ওকে মায়ের কাছে নিয়ে যাবো। তাই সে আমাকে জিজ্ঞেস করল,
- মা কোথায়?
আমি ইশারায় ময়ূরাক্ষীকে দেখিয়ে দিতেই ও আলতো করে পিঠে হাত রেখে,
-মা
বলতেই ওকে জড়িয়ে ধরে তীব্র চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করলো ময়ূরাক্ষী।
আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, তোমাদের রুমে গিয়ে আমি অধরার ছবি দেখতে চাওয়াতে আমাকে স্টোর রুমে নিয়ে গেল যেখানেই তুমিই অধরার সব জিনিসপত্র রেখে এসেছো। ওখানে একটা ড্রয়িং খাতা ছিলো। যেখানে অধরা কাঁচা পাকা হাতের ড্রয়িং ছিলো। শুধু একটা ড্রয়িং তোমার ছিলো।
একটা স্বর্গের সোনালী আকাশ, যেখানে দুইপাশে দুইটা ছোট্ট পরী নিয়ে উড়ে যাচ্ছে অন্য একটা পরী।
আমার তখন থেকে সন্দেহ হলো, তোমার ডেলিভারি হওয়া হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে পুরানো রের্কড ঘেঁটে জানলাম তোমার জমজ মেয়ে হয়েছিলো।
তোমার সব সিজ করা একাউন্ট ডিটেলস পুলিশের কাছে আছে। খালিদাকে বলে খোঁজ নিতেই বিত্তের খোঁজ পেলাম।
ময়ূরাক্ষী কিছু বলছে না। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে এখনো কান্না করে যাচ্ছে। এই যেন সুখের কান্না, এই যেন কষ্টের কান্না।
অনেক বছর পার হয়ে গেল। আমি ব্যস্ত হলেও ময়ূরাক্ষীকে ভুললাম না। কারণ অধরাকে আমিই ভালো স্কুলে রেখে পড়াতে সাহায্য করেছি।
ওর শাশুড়ী নিজেই একদিন সকালে মারা গেল। উনাকে আর শাস্তি দেওয়া হয়নি। বিশাল সে অট্টালিকা শূন্যই পড়ে রইলো।
আমি আবার দেশের বাইরে চলে এলাম। নিজের শরীরটা ভালো থাকেনা। তাই ছেলে নিজের কাছে এনে রেখেছ।
সকালে মৃদু আলো এসে পড়েছে টরেন্টো শহরে সবুজে ঘেরা এই বিশাল এপার্টমেন্টে। ছোট বড় নানা ফুলের গাছ। সবাই ব্যস্ত এইখানে। ছোট একটা নাতনী আছে তার ও ভোরে স্কুল। জয়ী আমার ছেলের বউ।
মেয়েকে স্কুলে দিয়ে ফিরল সে৷ এক হাতে লেটার বক্স থেকে কয়েকটা লেটার আর অন্য হাতে কিছু সকালের নাস্তা।
চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকে আমাকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখে জয়ী বলল-
- এত সকালে আপনি কেন উঠেন মা?
-অভ্যাস যে,
বাইরের জুতা খুলে ঘরের জুতা পরে কোট খুলে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাবার ব্যান্ড দিয়ে চুল উপরে তুলে বাঁধতে বাঁধতে বলে,
- ইউ গট এ লেটার টু ডে।
আমি চেয়ার থেকে পা নামিয়ে উঠতে যাবো তার আগেই জয়ী আমাকে চিঠিটা এনে দিলো।
লেটারটা দেশ থেকে আসে নি। পশ্চিমা দেশ থেকেই এসেছে।
প্রিয় ম্যাম,
আমি ময়ূরাক্ষী, দশ বছর পর জেল থেকে বের হলাম।
আপনার আর খালিদা ম্যামের জন্য হয়ত আমি এইদিনটার অপেক্ষায় সে অন্ধকার দিন গুলো কাটাতে পেরেছি।
তুহিনের আর আমার সব সম্পত্তি বিক্রি করে আমি একটা এসিড আক্রমণের শিকার আর যৌন হয়রানীর শিকার হওয়া মেয়েদের নিয়ে কাজ করে এমন একটা সংগঠনকে দান করে দিয়েছি।
আমি অধরাকে নিয়ে চলে এসেছি দেশ থেকে।মা মেয়ের ছোট্ট একট্টা ঘর হয়েছে একেবারে স্বর্গের আকাশের কাছাকাছি। ত্রিশ তলার উপর।
ইতি
আপনার মায়াবী।
সাথে একটা ছবি আছে। একই রকম দেখতে ভিন্ন বয়েসী দুজন ভয়ংকর সুন্দরীর ছবি। এখন যতবার আমি কোন সুন্দরী মেয়ে দেখি। আমি মনে মনে পরিমাপ করার চেষ্টা করি,
হাউ মাচ ডার্ক সাইড অফ দ্যা বিউটিফুল লেডি হ্যাভ???
-সমাপ্ত।
#বাংলা সাহিত্য
লেখিকা কে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমাদের এমন সুন্দর একটি গল্পউপন্যাস উপহার দেয়ার জন্য।
বাংলা সাহিত্যের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
আন্তরিক ভাবে দুঃখিত যে বিনা অনুমতি ছাড়া গল্পটি প্রকাশ করার জন্য। যদি কখনো লেখিকার দৃষ্টি গোচর হয় তাহলে আশা রাখি অনুমতি রাখবেন।
ভালোবাসা অবিরাম প্রিয় অপ্রিয় মানুষগুলোর প্রতি।

No comments