Header Ads

Header ADS

এক চিলতে আলোর অনুভুতি - রোহান

এক চিলতে আলোর অনুভুতি 

লেখক - রোহান






পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবে কি রে হায়;

ও সেই চোখের দেখা প্রানের কথা, সে কি ভোলা যায়। 

      -রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর 

 চোখ গুলো ভীষণ তীক্ষ্ণ, তিপ্তি মেলেনি বহুকাল। আজও পড়ন্ত বিকলে বারান্দায় দাড়িয়ে। মৃদু বাতাসে ছুঁয়ে যাচ্ছে হৃদয়। মনের কোণে এলো মেলো ভাবনারা খেলছে। পাওয়া না পাওয়ার হিসেব টা যে মনের অগোচরেই জমাট বেধেছে। জীবন কেন যে এত বৈচিত্র্যময় ? জীবন পথে যা পেয়েছি হারিয়েছি অনেক।

স্মৃতির ভাণ্ডারে তবু মনে পরে সেই ফেলে আসা দিন ফেলে আসা মহুর্ত।আবার যদি ফেরা যেতো ! তাহলে ফিরে যেতাম সেই শৈশবে, সেই যোবনে যেখানে আছে অপুরন্ত প্রানের সঞ্চার। 

চাইলেই কি সব হয়? ছোট থাকতে কত ভাবতাম, ইস্, কবে যে বড় হব, সেই বড় হওয়া আজ সত্য বটে। কিন্তু এই এক বড় হওয়াই যেন নিয়ে গেল জীবনের অবাধ স্বাধীনতার চিন্তাহীন নির্মল এক অধ্যায়। তাই মাঝে মাঝেই ফিরে তাকাই, ফিরে তাকাতে হয়। ভাবতে হয় সেই সব দিনের কথা। মনে পরে সেই ছেলে বেলা, মনে পরে ফেলে আশা দিন। জাগ্রত হয় হৃদয়ের কোনে এক বিন্দু পরশ ভুলানো অনুভুতি। কত সুন্দর অতিত গুলো হারিয়ে ফেলেছি জিবনের কত শত বস্ততায়।

সেই শৈশব সেই ছেলেবেলা, জোড়া পাঁচেক বন্ধু- বন বাধারে গুরে বেড়ানো, সব হারিয়েগেছে গতানুগতিক বয়সের সমিকরনে। বড্ড বেশি জানতে ইচ্ছে করে কেনই বা বড় হলাম, কেনই বা ছেলেবেলা হারালাম ? 

আজকাল চার পাশের বদ্ধ দেওয়ালে নিজেকে বড্ড বেশি অসহায় লাগে। ইচ্ছে করে সব কিছু উপেক্ষা করে , বয়স নামক বারন্ত দেয়াল ভেঙ্গে ছুটে যাই সেই মেঠো পথ ধরে –কখনো বা ভাবতে ভাবতে ছলছল করে উঠে চোখ, কখনোবা অকস্মাৎ ফেটে পড়ি হাসিতে।  জীবন! সে তো পদ্ম পাতার শিশির বিন্দু। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে একটু একটু করে প্রখর হওয়া ভোরের প্রথম আলোকরশ্মি কিংবা শীতের রাতে টিনের চালের টুপ-টাপ শব্দ – এইতো জীবন।  


আমার শৈশব 

শৈশব বলতেই মনে পড়ে হাজারটা রঙ্গিন –মলিন স্মৃতিমাখা অবাধ স্বাধীনতার অসাধারন কিছু দিনের কথা,  বাবা-মায়ের আদর-শাসনভরা মুহূর্ত।

হাটি হাটি পা পা করে যখন হাটতে শিখেছি, মা মা বলে যখন ডাকতে শিখেছি মায়ের চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়েছে সীমাহীন আনন্দ অশ্রু। কেউ বা কখনো দেখেনি সে অশ্রু বিন্দু। 

মাস ও বছরের সমীকরণে বাবা মায়ের আদর , পরিবারের ভালোবাসায় চলছে দিনগুলো অবিরত। দিন, মাস আর সময় গুলোকে যদি ওখানেই বেধে দেওয়া যেত , তাহলে জীবন নামক সেই ভিসন্নতার পিছু আর ছুটতে হয়তো না।

অ, আ – দিয়েই শিক্ষা জীবনে পা বাড়িয়েছিলাম। প্রত্যেকটা সন্তানের প্রথম শিক্ষক হলেন মা । হঠাৎ একদিন হাফ প্যান্ট, হাফ শার্ট আর মাথায় টুপি পরিয়ে পাঠানো হল ড্রয়িংরুমে। যেয়ে আবিষ্কার করলাম লম্বা পাঞ্জাবি পরনে, কালো দাঁড়ির আর মাথায় বিশাল টুপি দেয়া একজন হুজুরকে; সামনে হরেক রকমের নাস্তা সাজানো। আশ-পাশ ঘিরে আছে কিছু পরিচিত-অপরিচিত মুখ। হুজুরের পাশে বসানো হল আমাকে। পড়ানো হল অ, আ, a, b, আলিফ, বা, তা। এরপরই মিষ্টিমুখ। অতঃপর ‘ছাত্রজীবন’ এ আমার আনুষ্ঠানিক পদার্পণ। তার কিছুদিন পরেই বাবার হাত ধরেই শুরু হল জীবনের নতুন আরেকটি অধ্যায়।

নীল হাফপ্যান্ট, সাদা শার্ট, ডান বুকে নেমপ্লেট আর বামে স্কুলের ব্যাচ, কাদে স্কুলের ব্যাগ পরে সেই আঙিনায় প্রথম পা রেখেছিলাম বাবার হাত ধরেই। প্রথমেই নিয়ে গেলেন প্রধান শিক্ষকের রুমে। চশমা পরা, কাঁচা-পাকা দাঁড়ির প্রাণবন্ত সেই স্যার হাসতে হাসতে কিছু প্রশ্ন করলেন। এরপর পাঠিয়ে দিলেন ক্লাসরুমে। ক্লাস রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম, অপরিচিত কিছু মুখের দিকে আর তারচেয়েও বিস্ময়মাখা দৃষ্টিতে এক ঝাঁক ছেলেমেয়ে নির্বাক হয়ে দেখছে আমাকে।  ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া হলদে দালান, সামনে ছোটখাটো মাঠ, চার পাশে ফুলের সমারহ, সারি সারি গাছ, স্কুলের সাথে লাগানো পুকুরঘাট- চমৎকার ছিল পরিবেশটা।

মাঠের এক পাশে জাতীয় পতাকা, তার সামনেই প্রতিদিন সকালে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে গাইতাম “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।  

সেই সময়ে কোন এক বিচিত্র কারণে স্কুল আমার ভীষণ ভালো লেগে যায়। সেই ভালো লাগার উৎসটা আজ অব্দি খুঁজে পাই নি, তবে পেয়েছি হরেক রকম বন্ধু, কিছু অনুভুতি,কিচু ভালোলাগার মহুরত। পেয়েছি শিক্ষকদের অপুরন্ত ভালোবাসা।   

দিনের শুরুতে কাক ভেজা সকালে মায়ের হাতে বানানো টিফিন নিয়ে বেরিয়ে পরতাম স্কুল এর পথে। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়া, দক্ষিণ জানালার পাশের সিট এ সবার আগে বসার প্রতিযোগিতা, সেই আধভাঙ্গা সিট ষ্টোর রুম এ লুকিয়ে রাখা , টিফিন হলেই রফিকের মামার দোকানে ছুতে যাওয়া। ‘বরফ-পানি’ খেলায় মেতে উঠা। মাঝে মাঝে মনিকা ম্যাডামের ক্লাসে কবিতা ,গান, আবৃতিতে মেতে উঠা। ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরা, মায়ের আদুরে শাসন আর বোনের খুনসুটি। সচারচর বন্ধুদের সাথে ঝগড়া, বিভিন্ন ধরনের এক চাকা,দুইচাকা, তিন চাকা এমনকি চারচাকার গাড়ি দিয়ে খেলা । গাছের উঠা, ডাল ভেঙ্গে পাখি ও পাখির বাসা নিয়ে আসা, এ সময় গুলো গেঁথে আছে হৃদয়য়ের কোণে বিশাল একটা জায়গা জুড়ে। দিন শেষে যখন সন্ধার আধার নেমে আসতো , মা প্রদীপ তা জ্বালিয়ে দিতেন, হালকা বাতাসে প্রদীপটা নিভু নিভু করত, দরজা জানালা গুল আটকে দিতাম, ভাই বোন সবাই এক সাথে পড়তে বসতাম। হাজার টা খুন-সুটিতে মেতে উঠতাম। ছুটির দিনে নানা বাড়ি, খালা বাড়ি যাওয়ার তিব্র আনন্দ খেলা করত হ্রদয়ের কোণে। 

দিন গুলো যতই যাচ্ছে ক্লাস বাড়ছে- চলছে প্রথম হওয়ার প্রতি যোগিতা, সফলতা দিয়ে ততো দিনে শিক্ষকদের মনে ভরশা ও আস্থার একটা জায়গা করে নিয়েছি। পেয়েছি সহপাঠীদের ভালোবাসা।   

তাই কবির ভাষায় বলতেই হয়-                      

            ইচ্ছে করে ফিরে যেতে শৈশবের ঐ কালে-

 যেথায় পরে আছে মন কানামাছি আর এক্কা দোক্কা খেলে । 


হৃদয়ের আকা স্মৃতি

তবে দুই জন বেক্তি আছে যাদের কথা একটু আলাদা করে লিখতেই হয় দারোয়ান মামা ও দপ্তরি দাদু ভাই। ওদের সঙ্গে বন্ধুত্বের শুরুটা হয়েছিল তিক্ততা দিয়ে। 

 এই মহুরতে নাম গুলো মনে পড়ছে না, কিন্তু চেহারা গুলো দিব্যি চোখে ভাসে আজো। কাঁচা-পাকা চুল, জমিদারি গোঁফ আকাশী রঙের ইউনিফর্ম পরা হাস্যোজ্জ্বল এক চেহারা। মনে হয়, এইতো সেদিন- জমিদারি গোঁফে হাত বুলাতে বুলাতে ডান হাতে পিতলের ঘণ্টা আর হাতুড়ি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন স্কুলের বারান্দা দিয়ে। অতঃপর- ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং……। সাথে সাথে চিৎকার করতে করতে এক ঝাঁক দুরন্ত ছেলেমেয়ের দৌড়ঝাঁপ শুরু। দারোয়ান মামা তো আগ থেকেই গেট খুলে রাখতেন, আর লক্ষ রাখতেন কেউ যেন পরে না যায়। 

দুইটা জিনিস ভীষণ ভয় পেতাম ছেলেবেলায়। বজ্রের শব্দ আর উড়ন্ত তেলাপোকা। এখনও মনে পড়ে- যখনি বজ্রেপাত হতো তখনি ছোটছোট হাত দিয়ে আব্বু-আম্মু যাকেই পেতাম, জড়িয়ে ধরতাম। উড়ন্ত তেলাপোকার কথা আর নাইবা বললাম।

মনে পরে সেই মেঘলা দিনে, ঝর বৃষ্টি উপেক্ষা করে মায়ের কড়া শাসন ভেঙ্গে দল বল নিয়ে ছুটতাম খেলার মাঠে । আম তলায় আম কুড়াতে। খেলা শেষে ঘরে ফিরে মায়ের বকুনি আর শাসন, বোনের ছুটে আসা আগলে নেওয়া। ফের এ ছুটে চলা।

স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী উৎসবের আয়োজন ছিল বেশ আনন্দের। সারাবছর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করতাম। সেদিনটা হৈ-হুল্লোড়, আনন্দ-কোলাহল, আমোদ-কৌতুকে কেটে যেত। এ দিনে বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল ও নানা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হতো। কেউ কেউ ভালো ফলের জন্য পুরস্কার না পেলেও ভালো আচরণ ও নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার জন্য পুরস্কার পেত। আজ আর নেই সেই দিন গুলো হারিয়ে গেছে সময়ের অতল গহভরে।

বৃষ্টিতে ভেজা সন্ধ্যায় সুধুরে কেউ এক জন দাড়িয়েছিল, কিছুটা অস্পষ্ট লাগছিল,তাই একটু একটু করে এগিয়ে গিয়েছিলাম। গোলক ধাঁধার মত পৃথিবী টাও কেমন যেন থমকে গেছে। এখন যে বিষয়টা বুঝতে পাচ্ছি সেটা হলো- জ্বর, সর্দি, কাশি আর মাথা ব্যথ্যা, হয়ত আরেকটু হলে নিউ মেনিয়া হতো! সেটা এই শুয়ে শুয়েই টের পাচ্ছি ! তাতে কি? এই সুখ- এই স্মৃতির মূল্য এই চেয়ে অনেক দামী। এই সুখ-স্মৃতিই আমার দৃষ্টতে এ বছরের সেরা একটি। সত্যিই মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন অনেক সুন্দর! এই অনুভূতিগুলোই কোটি কোটি বছর বেচে থাকার শক্তি যোগায়।

সময়ের স্রোত অতীত ফিরিয়ে দেয় না। তাই স্মৃতি হাতড়ে বেঁচে থাকতে হয় জীবনভর।।


সোনালি যৌবন

অনন্ত কালের পথে হেটে চলেছি এক গুচ্ছ স্বপ্ন নিয়ে ।তিল তিল করে গড়ে তুলেছি নিজেকে। যোগ্যতার আসনে অধিষ্ঠিত করার প্রয়াসে। শুধুই এক গুচ্ছ স্বপ্ন পূরণের আশায়। সেই জন্মের পর থেকে পৃথিবীর পথে পথে একেকটা ঘটনার জন্ম, সময়ের সাথে নিজেকে স্রোতের মাঝে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা, সমাজের নিয়মের গণ্ডি এ হৃদয় টা গ্রাস করেছে ।  

No comments

Powered by Blogger.