একথোকা কৃষ্ণচূড়া | আর্শিয়া ইসলাম উর্মি
আর্শিয়া ইসলাম উর্মির ধারাবাহিক উপন্যাস (একথোকা কৃষ্ণচূড়া)
১,
" মি'থ্যা কেনো বলেছিলেন সেদিন? আপনি অবিবাহিত বাচ্চা একটা মেয়ে হয়ে নিজেকেই এক বাচ্চার মা বানিয়েছিলেন নিজেকে! "
ফোনে টুংটাং মেসেজের শব্দে ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ খুলে পড়তেই কথাগুলো দেখতে পায় ধারা। সে আবার কবে কাকে মিথ্যা বললো! আর সে বাচ্চা মেয়ে! আসলেই! লোকটা কি পা'গ'ল। আজব তো। মেয়েটা মেসেজ টাকে অগ্রাহ্য করে বইয়ের দিকে মনোযোগ দিলো। সময়টা রাত দুটো। এইচএসসি বোর্ড পরিক্ষা চলছে ধারার। আর ৩টা পরিক্ষা বাকি, শেষ হলে যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচে সে। এরমাঝে এই এতো রাতে কে কি মেসেজ দিলো গুরুত্ব দেওয়ার সময় নেই ধারার। ঘুম থেকে উঠেছেই দেড়টায়। ছোটোবেলা থেকেই অভ্যাস তার, পরিক্ষার সময়, রাত দেড়টায় উঠে পড়া শুরু করে, পরিক্ষা দিয়ে এসে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে একটু রেস্ট নিয়েই ঘুমিয়ে পরে। অভ্যাসটা তার বড় বোন করে দিয়েছে ছোটো থেকেই। সেজন্যই প্রতিবারের রুটিন মোতাবেক এবারও দেড়টায় উঠে কম্বল মুড়িয়ে বই নিয়ে পড়ছে সে। ফোনটা পাশে পরে ছিলো, তখনই মেসেজটা আসে। চোখ থেকে ঘুম ছাড়েনি তার। এই মুহুর্তে কড়া লিকারের চা দরকার তার। মাথা-টাও ব্যথা করছে আজ। ব্যথাটা মাইগ্রেনের দিকে ধাবিত হলে পরিক্ষা আজ কতটা ভালো হবে! ভাবতেই গা শিউরে উঠলো ধারার। আলসেমি ছেড়ে কম্বল ফেলে পা বাড়ালো রান্নাঘরের দিকে। আজ আম্মু থাকলে নিজেকে অন্তত চা বানিয়ে খেতে হতো না তার। আম্মু শব্দটা মাথায় আসতেই নিজের প্রতি বিরক্ত হলো ধারা। সব চিন্তা বাদ দিয়ে চা বানাতে হবে সেদিকে ধ্যান দিলো৷ নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় পা দিতেই ঘন কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত আকাশের চাঁদ টাকে নজরে পরলো তার। মুচকি হেসে বড় ভাইয়ের ঘরের দিকে তাকালো,এখনও লাইট জ্ব''ল'ছে রুমের অদ্ভুত। অবশ্য তার ভাই আগামাথা পুরো টাই অদ্ভুত। অনার্স ১ম বর্ষের ফাইনাল পরিক্ষা হয়ে গিয়েছে। তবুও তার ভাই রাত কেনো জাগছে বুঝেনা ধারা। বুঝার চেষ্টা বাদ দিয়ে সে চা বানাতে গেলো রান্নাঘরে। উঠোনের এক কোণায় রান্নাঘর,অন্য কোণায় কলপাড়। চায়ের জন্য পানি নিয়ে এসে চা বসিয়ে দেয় গ্যাসের চুলায়। মাটির চুলার পাশাপাশি সময়ে অসময়ে ব্যবহারের জন্য গ্যাস সিলিন্ডার আর চুলাও কিনে দিয়েছে তার বড় আপু। কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার দরুণ সে তাদের সাথে থাকেনা। বড়বোন আর বড় ভাই ধারার দুনিয়া। বাবা সে তো, ধারা আড়াই বছরের থাকতেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন লিভার ক্যা'ন্সা'রে। আর মা! মায়ের কথা মাথায় আসতেই তাচ্ছিল্যের সহিত হাসি হাসলো ধারা। চায়ের পানি গরম হতেই লিকার দিয়ে একটু সময় নিয়ে ফু'টি'য়ে চা তৈরি করে নিলো ধারা। মগভর্তি চা না হলে চলে না ধারার। মগভর্তি চা নিয়ে কিছু টা চা ফ্লাক্সেও তুলে রাখলো। রাতের বাকি প্রহর গুলো তার চা খেয়েই জাগতে হবে। এটা তার বদঅভ্যেস হয়ে গিয়েছে। রান্নাঘর ছেড়ে চা নিয়ে বেরুতেই দেখে বড় ভাই সৃজান দাড়িয়ে ফোনে কিছু একটা করছে। তাদের গ্রাম টা উপজেলার শেষের প্রান্তে হওয়ায় নেটওয়ার্কের যে ঢেড় সমস্যা আছে সেটা জানে ধারা। সেজন্য হয়তো নেট খুজতে ফোন নিয়ে বাইরে বের হয়েছে সৃজান। সেটা বুঝেই সৃজানকে বিরক্ত করলোনা সে। এখন কথা বললেই ঝ'গ'ড়া লেগে যাবে।পিঠাপিঠি ভাইবোন হলে যা হয়। সৃজান তার থেকে মাত্র তিনবছরের বড় যে। ঘরে যাওয়ার সময় অবশ্য সৃজান ধারার উদ্দেশ্যে মজা করে পে'ত্নী বলে ডেকেছিলো। সৃজান যে ধারাকে পে'ত্নী বলেই অভ্যস্ত। আর দুই ভাইবোনের মাঝে এটা নিয়েই ঝ'গড়া লেগে যায়। ধারা গায়ে মাখেনি সৃজানের ডাক৷ পড়াগুলো কমপ্লিট করে ফেলতে হবে তার। সারাবছর পড়ার খবর কমই থাকে। পরিক্ষার আগের রাতে সিলেবাস শেষ করার মতো ম'জা বোধহয় কোনো শিক্ষার্থীরই অজানা নয়। ধারাও তাদের মাঝে একজন।রেজাল্ট মোটামুটি রকম ভালো হয় এটাই তার কাছে আলহামদুলিল্লাহ। মগ ভর্তি চা খেতে খেতে পড়ায় মনোযোগ দিয়েছে ধারা। এরমাঝে সময় দেখতে ফোন হাতে নিতেই দেখে আরও একটা মেসেজ। তাতে লিখা,
" রিপ্লাই করছেন না কেনো? আমি জানি আপনি জেগে আছেন। "
এ আবার কোন হালের ব'ল'দ যে তার ব্যাপারে সব জেনে বসে আছে। মেসেজটা দেখে এরকম টাই ভাবলো ধারা। নাম্বার টা ব্লক করে দিয়ে পড়ায় মনোযোগ দিলো।
২,
সকাল সকাল ননদ আর তার দেবরকে বাসায় আসতে দেখে অবাক হয় সাজিয়া। হালকা একটু জ্বর থাকায় আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে তার। ঘরের দেয়ালে টাঙানো ঘরিতে সময় দেখে নিলো। ৭ঃ৩৩ বাজে। এতো সকালে আসার কারণ উদঘাটন করতে পারলোনা সাজিয়া। সে বিছানা ছেড়ে নেমে ছেলেকে খুজলো পুরো রুমে নজর বুলিয়ে। কোথাও না পেয়ে ড্রইং রুমে এসে দাড়ালো। ড্রইং রুম থেকেই ননদের গলার স্বর শুনে সে আন্দাজ করেছিলো তাহিরা এসেছে। তাহিরা সাজিয়ার ননদের নাম। কিন্তু সাতসকালে আসার কারণ কি উদঘাটন করতে তাহিরা-কে ড্রইং রুমে দাড়িয়ে জিগাসা করলো,
" আরে তাহু! তুমি এতো সকালে? শ্বশুর বাড়িতে সব ঠিক আছে তো? "
" হ্যাঁ ভাবী সব ঠিক আছে। এমনিই সবাইকে খুব মনে পরছিলো। কান্না করে দিয়েছিলো ভাবী সকাল সকাল। সেজন্য আমি সাথে করে নিয়ে আসলাম। "
সাজিয়ার প্রশ্নে তাহিরার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে উত্তরটা দেয় তাহিরার দেবর শ্রাবণ। তাহিরা ভেবাচেকা খেয়ে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে আছে।কি ডাহা মি'থ্যা বললো শ্রাবণ। আসার জিদ কার ছিলো,আর কার উপর চাপিয়ে দিলো। তাহিরার সদ্য সদ্য বিয়ে হয়েছে। সবে দুইমাসে পা পরলো বিয়ের। তাই সাজিয়া বিনাবাক্যে কথাগুলো মেনে নিলো। ড্রইং রুমে আর কাউকে না পেয়ে ফের জিগাসা করলো,
" তাহিরা! আম্মু, তোমার ছোটো ভাবী কোথায়? তোমরা এসেছো, গলা ফা''টিয়ে ডাকলে। অথচ তাদের হদিস নেই যে! "
" ভাবী আম্মু আর ছোটো ভাবী নাস্তা বানাতে রান্নাঘরে গেছে। তুমিও যাও, তাদের পেয়ে যাবে। "
" আমি একটু ফ্রেশ হয়ে নিই। শীতের সময়, ঠান্ডায় একটু জ্বর জ্বর ভাব এসে গেছে। আমি আসছি,তোমরা বসো,নয়তো তোমার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হও। শ্রাবণকে গেস্ট রুম দেখিয়ে দাও। "
কথাগুলো বলেই সাজিয়া রুমের দিকে পা বাড়ালো। তাহিরা বড় ভাবীর কথামতো শ্রাবণকে গেস্ট রুম দেখিয়ে দিতে উঠে দাড়ালো। যেতে যেতে শ্রাবণকে প্রশ্ন করলো,
" এখানে আসার তাড়া ছিলো তোমার ভাইয়া। আমার উপর সব দো'ষ চাপিয়ে দিলে। ব্যাপার কি বলো তো? "
" সময় হলেই বুঝবে ভাবী। আপাতত ফ্রেশ হয়ে খেয়ে পরবর্তী প্ল্যান অনুযায়ী কাজ করা যাবে। তুমিও তোমার রুমে চলে যাও এখন। "
তাহিরা শ্রাবণের থেকে বয়সে প্রায় পাঁচ বছরের ছোটো, কিন্তু সম্পর্কে বড় । বয়সে বড় হওয়ায় শ্রাবণকে সে ভাইয়া ডেকে আপনি সম্মোধন করতো। কিন্তু শ্রাবণ অনেক চঞ্চল একজন মানুষ৷ তাহিরা তাকে আপনি করে বলুক এটা সে মানতে নারাজ। তারমাঝে হয় ছোটো দেবর। সেজন্য সে তাহিরাকে তুমি বলতে বলে। বিনিময়ে তাহিরাও তাকে তুমি বলে সম্মোধন করতে শর্ত দেয়। সেজন্য তারা একে-অপরকে তুমি বলেই ডাকে এখন৷ তাহিরা শ্রাবণকে গেস্ট রুমে পৌছে দিয়ে নিজের রুমে আসে। বিয়ের অনুষ্ঠানের পর সেভাবে এসে থাকা হয়নি বাবার বাসায়। শ্রাবণ সেটারই সুযোগ নিলো। কি করতে চায় সে আর খোদা জানে। তাহিরা নিজের রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নেয়। বিয়ের পর মেয়েদের বাবার বাড়িতেও যে অতিথি হতে হয়, কথাটার গুরুত্ব সে আগে দিতো না। এখন নিজে এই পরিস্থিতিতে পরে গুরুত্ব দিতে শিখেছে। ভাবীদের আগে কত বলতো, ' আমার বাবা মা কি তোমাদের বাবা মা না! এতো বাবার বাসায় যেতে চাও কেনো? ' এখন সে প্রতিক্ষণে বুঝে কেনো প্রতিটা নারী বিয়ের পর বাবার বাসায় আসতে উৎসুক হয়ে বসে থাকে। শ্বশুড় বাড়িতে যেনো মন টিকে সেজন্য তার শাশুড়ি সেভাবে এসে থাকতে দেয়নি তাকে। যদিও মা আর শ্বাশুড়ি মায়ের পার্থক্য সে বুঝেনি, কিন্তু তবুও মা তো। নিজের আলমারীর ভাজে নিজের পুরাতন কাপড় গুলোয় হাত বুলাতে বুলাতে কথাগুলো ভাবছিলো তাহিরা। এরমাঝেই তার ছোটো ভাবীর ডাক। খেতে ডাকছে সে। সকাল বেলা শ্রাবণ যখন তাকে বললো, ' তাকে বাবার আসতে জিদ করতে হবে, খাওয়া দাওয়া রেখেই আগে শ্রাবণের কথা শুনতে হয়েছে তার। নয়তো শ্রাবণের নাকি খুব ক্ষ'তি হয়ে যাবে। কি ক্ষ''তি সেটা শ্রাবণ বলেনি। শ্রাবণের জিদে অগত্যা রাজী হতে হলো তাকে। তাহিরার স্বামী ঢাকা শহরে একটা কোম্পানিতে চাকরি করে বিধায় সে বাড়িতে নেই। তাই জিদ করতেই শ্বাশুড়ি মা শ্রাবণের সাথে তাকে পাঠিয়ে দিলো। শ্রাবণ কি করতে চাইছে শ্রাবণই ভালো জানে। ফ্রেশ হয়ে তাহিরা ডাইনিং টেবিলে এসে বসে। আগে থেকেই সবাই সেখানে বসে ছিলো। সে যেতেই সাজিয়া খাবার সার্ভ করে দিলো সবাইকে। খাবার টেবিলে শ্রাবণ,তাহিরার বাবা-মা, সাজিয়ার ছেলে তাহসিন, তাহিরার ছোটো ভাইয়ের ছেলে লাম বসেছে।তাহিরার ছোটো ভাবী তৃপ্তি দুই ছেলেকে তুলে খাওয়াচ্ছে। দুজনেই সম বয়সী প্রায়। তাহিরার দু'ভাই বড়জন প্রবাসে আছে, ছোটোজন একটা এনজিও চালায় বিধায় দুজনই খাবার টেবিলে নেই।বড়জনের পক্ষে তো থাকা সম্ভবই না,ছোটোজন সকাল ৬টা বাজতেই উঠে চলে যায়। এখন সময় আট টা প্রায় সেজন্য সেও নেই খাবার টেবিলে। সবারই খাওয়ার মাঝে শ্রাবণ হুট করে বলো উঠে,
" তাওই একটা কথা বলার ছিলো। যদি অনুমতি দিতেন, বলতাম। "
৩,
সাজিয়ার শ্বশুর আলম সাহেবের অনুমতি পেয়ে শ্রাবণ বলে,
" তাওই আপত্তি না থাকে তো আমরা সাজিয়া ভাবীর বাড়ি গিয়ে গ্রাম ঘুরে দেখে আসতে চাই। শহরের ধুলাবালি ইটপাথরে বিরক্তি এসে গিয়েছে। সেজন্য চাচ্ছি আমরা ছোটোরা মিলে একটু গ্রামের মুক্ত পরিবেশে ঘুরে আসতে চাই। আমি শুনেছি ভাবীর কাছে বড় ভাবীর বাবার বাড়ি গ্রামে।"
একদমে কথাগুলো বলে থামে শ্রাবণ। তাহিরা চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রাবণের সাথে একদিন এমনিই পরিবার নিয়ে গল্প করার সময় তার ভাবীদের বাবার বাসা কোথায়,পরিবার কেমন সেগুলোও জেনে নিয়েছিলো। কিন্তু হুট করে সাজিয়া ভাবীর বাবার বাসায় ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপার টা বুঝতে পারলোনা তাহিরা। এদিকে আলম সাহেব শ্রাবণের কথায় উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে পুত্রবধু সাজিয়ার দিকে তাকালেন। বাকি সবাই উৎসুক জনতা হয়ে আলম সাহেব কি বলেন তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ এরমাঝে সাজিয়ার উদ্দেশ্যে আলম সাহেব বলেন,
" মা সাজিয়া! তোমার কি মতামত? "
শ্বশুর মশাইয়ের প্রশ্নে সাজিয়া চিন্তিত হয়ে তাকালো উনার দিকে। তৃপ্তি বাচ্চা দুটোকে খাওয়ানো শেষে হাত ধুয়ে তাদের মুখ মুছিয়ে দিয়ে সাজিয়াকে বললো,
" ধারার পরিক্ষা চলছে, এরমাঝে আমরা যদি যাই সমস্যা হবে। কিছু ভুল বললাম ভাবী? "
তৃপ্তির কথার সুর ধরে তাদের শ্বাশুড়ি মা শান্তি বেগম বলেন,
" তৃপ্তি তো ঠিকই বলেছে। ওর কথাও বিবেচনা করা উচিত। "
সবার কথায় খানিকটা হতাশ হলো শ্রাবণ৷ তার মনের মাঝে যে ঝ''ড় চলছে, তার সমাধান তো হচ্ছে না। কি করবে সে,চিন্তায় মাথা নিচু করে নিলো। সাজিয়া ব্যাপার টা খেয়াল করলো৷ মনে মনে ভাবলো, 'শ্রাবণ যখন শখ করে যেতে চেয়েছে,নিয়ে যাই। ধারার পরিক্ষা, ওকে কেউ বি''রক্ত না করলেই হলো।' এটা ভেবেই সাজিয়া বললো,
" সমস্যা নেই, বাবার অনুমতি থাকলে আমরা যাচ্ছি। "
সাজিয়ার কথায় বেশ উৎফুল্লতা প্রকাশ পেলো শ্রাবণের চোখে মুখে। তাহিরা শ্রাবণের মতিগতি বুঝতে পারছেনা ঠিকঠাক । এরমাঝে তৃপ্তি বললো,
" ভাবী আপনারা যান। আমি থাকি? বাবা-মাকে তো রান্নাবান্না করে খাওয়াতে হবে,খেয়াল রাখতে হবে তাইনা?"
" না তৃপ্তি মা, তুমিও গিয়ে ঘুরে আসো সবার সাথে, ভালো লাগবে৷ আমি এতোটাও বুড়ো হইনি,দুবেলা রাধতে পারবোনা৷ বাকি সব কাজ তো কাজের লোক এসেই করে দেয়। "
শ্বাশুড়ি মায়ের কথার উপর তৃপ্তি আর না করলো না। সবার খাওয়া শেষে সাজিয়া আর তৃপ্তি খেয়ে নিয়ে যে যার রুমে গেলো সব গুছিয়ে নিতে।
এদিকে তাহিরা নিজের সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে গেস্ট রুমে শ্রাবণকে ডাকতে আসে। আসার সময় তেমন কিছু তারা আনেনি। কিন্তু শ্রাবণ এভাবে হুট করে তার বড় ভাবীর বাবার বাসায় শুধু যে ঘুরতে যাবেনা, এটা তাহিরা নিশ্চিত। কিন্তু যাবে কেনো এটাই এখন জানার বিষয়। দরজায় দাড়িয়ে নক করে সে। শ্রাবণ তাহিরাকে দেখে বলে,
" আরে ভাবী আসো। তোমার আবার আমার রুমে আসতে নক করতে হয় নাকি? "
" করতে হয় করতে হয় বুঝলা ছোটো দেবর । বউ হলে তখনও যদি নক না করে ঢুকে পরি আর তোমাদের রোমান্স দেখে ফেলি! কি রকম হবে। তাই এখন থেকেই নক করে ঢোকার প্রাক্টিস করে রাখছি। "
" বেশ ভালো ভাবী। সিঙ্গেল দেবরকে বউ না হতেই মিঙ্গেল বানিয়ে দিলে। "
" দেবর আদৌও সিঙ্গেল তো? "
" মানে কি বুঝাতে চাচ্ছো ভাবী? "
তাহিরার শেষ কথায় অবাক হয়ে প্রশ্ন করে শ্রাবণ। তাহিরা শ্রাবণের মুখা ভঙ্গি দেখে হেসে বলে,
" আরে এতো অবাক হওয়ার কি আছে? দেবর অনার্স শেষ করে, মাস্টার্সে পড়তেছে, সে সিঙ্গেল তো আদৌও? নইলে এভাবে আচমকাই আমার বড় ভাবীর বাবার বাড়ির এলাকায় যেতে চাচ্ছো? শুধু ঘুরতেই? নাকি অন্য উদ্দেশ্য আছে বলো তো? "
" তুমি না জিনিয়াস ভাবী। জার্নালিজম নিয়ে পড়লে জীবনে ভালো একটা ক্যারিয়ার হতো। তোমার ব্রেইন ভালো। "
শ্রাবণের মুখে নিজের নামে অযথা প্রশংসা শুনে তাহিরা ভ্রূকুটি করে বলে,
" কথা এড়িয়ে যাচ্ছো ভাইয়া? আমার বাপু এতো সাংবাদিক হয়ে কাজ নেই। বাংলায় অনার্স কমপ্লিট করতেই যথেষ্ট হেপা পোহাচ্ছি। আরও দুইটা বছর বাকি। কি যে য'ন্ত্র'ণা পড়াশোনায়। আর চাইনা, মাফ করো। আসল কথা বলো। "
তাহিরার কথা শেষ হতে না হতেই সাজিয়ার ডাকে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে দুজনেই একসাথে ড্রইং রুমে আসে। আসতেই সাজিয়া বলে গাড়িতে গিয়ে উঠতে। এরপর সবাই বাবা-মাকে বিদায় জানিয়ে রওনা দেয় সাজিয়াদের গ্রামের উদ্দেশ্যে।
একথোকা কৃষ্ণচূড়া | আর্শিয়া ইসলাম উর্মি
৪,
পরিক্ষা দিয়ে মাত্র বাসায় ফিরলো ধারা। দুপুরের শিফটে পরিক্ষা হচ্ছে তার। উঠানের গেট খুলে ভেতরে পা দিয়েই হিজাবের পিন খোলায় ব্যস্ত হয়ে পরে সে। একহাতে পরিক্ষার যাবতীয় জিনিসের ফাইল ধরে অন্য হাতে হিজাবের পিন খুলতে খুলতে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। বাড়িতে যে আরও কিছু মানুষ উপস্থিত আছে সেদিকে তার ধ্যান নেই। তখনই ধারার সামনে উপস্থিত হয় সাজিয়া। বড় বোনকে এই অসময়ে দেখে একটু আশ্চর্য হয় সে। সাধারণত দুই ঈদ ছাড়া বিয়ের ছয় বছরে বাবার বাসায় আসা হয়না সাজিয়ার। মাঝে মাঝে দরকারে আসলে আসার আগে ফোন করে আসে। স্বামী প্রবাসে থাকে, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় থাকে সাজিয়ার স্বামী,সেজন্য বাবা মায়ের সাথেই বেশি থাকতে বলে গেছে সে। এজন্য বাবার বাসায় আসা তার জন্য একপ্রকার নিয়মের মতো, ঈদের পরদিন ছাড়া আসা হয়না। ধারার এই বিষয় নিয়ে অবশ্য বোনের উপর ভীষণ অভিমান জমে আছে। ছোটো থেকে বড় হয়েছে বোনের কাছে। মা-কে পায়নি সে। সেজন্য বড় বোন মা সমতুল্য ধারার কাছে। সেই বোনকেও অনার্স ২য় বর্ষে উঠতেই বিয়ে দিয়ে দেয় চাচা ফুফুরা মিলে। ভাইবোনের দোহায় দিয়ে পড়াশোনা শেষ করা অব্দি বিয়েতে নাকচ ছিলো সাজিয়ার। কিন্তু চাচা-ফুফুদের তার মৃ"ত ভাইয়ের বিয়ের যোগ্য মেয়েকে নিয়ে চিন্তা ছিলো, খুজে খুজে ভালো পাত্র পাওয়ায় বিয়ে দিয়ে দেন। এতিম মেয়েকে অবশ্য তার শ্বশুড় বাড়ির লোকজন সাদরে গ্রহণ করেছিলো। বিয়ের পর পড়াশোনাটা শে'ষ করেছে সাজিয়া। শুধু একটা কথাই রাখেননি তারা। দুলাভাই প্রবাসে থাকে, ধারা চেয়েছিলো বোন তাদের সাথে থাকুক, সাজিয়ার স্বামী শহিদ দেশে একেবারে চলে আসলে সাজিয়াও চলে যাবে। কথাটা রাখেনি শহিদ। এজন্য বোনের উপর অবশ্য একরাশ অভিমান ধারার। কিন্তু পরের বাড়ি,পর যা বলে বিয়ের পর সেটাই শুনতে হয় নারীদের। কিছু করার নেই।বিয়ের পর পড়াশোনা শেষে অর্ধ সরকারি একটা স্কুলে সহকারী শিক্ষিকা পদে চাকরি পায় সাজিয়া। বেতনটুকু সব ভাইবোনের খরচ হিসেবে পাঠায়। এজন্য যেনো আরও বাবার বাসায় আসা হয়ে উঠেনা তার৷
অতীতের কথা মনে হতেই অশ্রসজল চাহনীতে তাকায় ধারা। বোনকে এই অবস্থায় দেখে সাজিয়া জাপ্টে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে । সেই আড়াই বছর বয়সী বোনকে রেখে মা''রা যায় তাদের বাবা। ছোট্ট ভাই আর বোনকে নিয়ে বাঁচার লড়াইয়ে সাজিয়া নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছে৷ দুইবোন অনেক দিন পর একঅপরকে কাছে পেয়ে অনবরত কেদে চলেছে। তাহিরার বিয়ের সময় গিয়েছিলো, তখন বোন তো ননদের বিয়ে নিয়েই ব্যস্ত ছিলো সময় দিতে পারেনি। দুইবোনের এই আবেগঘন মুহুর্তে উঠানের গেট দিয়ে প্রবেশ করে শ্রাবণ আর সৃজান। দুইবোনকে কাদতে দেখে সৃজান ধারার উদ্দেশ্যে বলে,
" কিরে পেত্নী? আপু আসতে না আসতেই কাঁন্না শুরু করে দিয়েছিস। "
সৃজান কথাটা একটু জোড়েই বলে। শ্রাবণ দু-হাত বুকে বেঁধে তাদের দেখছে। ঐ সময় ঘর থেকে তাহিরা, তৃপ্তি লাম আর তাহসিনকে নিয়ে উঠোনে আসে। তাহসিন খালামনিকে দেখে তাহিরার কোল থেকে নেমে দৌড়ে এসে ধারার কোলে উঠে। তখুনি শ্রাবণ ধারার উদ্দেশ্যে বলে,
" এটা আপনার ছেলে তাইনা ধারা?"
শ্রাবণের কথায় তার দিকে নজর দেয় ধারা। এতক্ষণ তাকে খেয়াল করেনি সে। খেয়াল হতেই বলে উঠে,
" আপনি? এখানে? "
৫,
" তুই শ্রাবণকে চিনিস ধারা?"
শ্রাবণের প্রতি ধারার অভিব্যক্তি দেখে প্রশ্নটি করে সাজিয়া। ধারা বড় বোনের কথার উত্তর দিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
" না। ইয়ে মানে হ্যা চিনি।"
" তো এতো না হ্যাঁ মানে মানে শুরু করছিস কেনো? "
" আরে ভাবী ওনাকে এতো প্রশ্ন করে বিব্রত করবেন না। আমি ক্লিয়ার করছি ব্যাপারটা। আসলে ভাইয়ার বিয়ের সময় ধারা উনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিলো একঝলক।আমি জানতাম না উনি আপনার বোন। তাহসিনকে উনার কোলে দেখে আমি জাস্ট উনার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, ' বাচ্চাটা উনার কিনা!' উনি উত্তরে হ্যাঁ বলেন। সেজন্য আর কি আমি ওভাবে প্রশ্ন করেছি। "
ধারার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে উত্তরটা দেয় শ্রাবণ। শ্রাবণের উত্তর নরমালই নেয় সবাই। যেহেতু বিয়ে বাড়ি, দেখা হতেই পারে দুজনের। কিন্তু শ্রাবণের কথার পরিপ্রেক্ষিতে তৃপ্তি ধারার উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
" তো ধারা তুমি তাহসিন বাবাইকে নিজের সন্তান বলেছিলে কেনো শ্রাবণের কাছে? "
ধারা নিরলস ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
" বড় বোনের সন্তান নিজের সন্তান হয় খালাজাতীর। এটা আমাদের খালাগত অধিকার।"
উত্তর দিয়েই ধারা তাহসিনকে কোলে নিয়েই নিজের ঘরের দিকে হনহনিয়ে হাটা ধরে। উপস্থিত সকলে ধারার এমন উত্তরে তার দিকে অবাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে উঠানেই দাড়িয়ে থাকে। তাহিরা পরিবেশ টাকে স্বাভাবিক করতে সৃজানের উদ্দেশ্যে বলে,
" কিন্তু সৃজান তুমি আর শ্রাবণ ভাই কোথায় ছিলে এতক্ষণ? "
" আমার ফোনে রিচার্জ করতে হতো, সেজন্য একটু বাজারের দিকে গিয়েছিলাম। "
শ্রাবণ আবারও সৃজানের বদলে উত্তর দিয়ে দেয়। শ্রাবণের কথা ফুরোতেই সাজিয়া বলে উঠে,
" তোমরা ঘরে যাও। আমি রাতের রান্না শেষ করে আসছি। "
" ভাবী আমি আপনার সাথে থাকি?"
প্রশ্নটি করে তৃপ্তি। উত্তরে সাজিয়া মুচকি হেসে বলে,
" লামকে নিয়ে ঘরে থাকো বোন। এটা গ্রাম,ঠান্ডাও বেশি। লাম বাবার ঠান্ডা লেগে যাবে। "
তৃপ্তি মাথা নাড়ায় বড় জা-য়ের কথায়। তাহিরা তার ভাবীদের কথার জবাবে বলে,
" আমার তো আর বাচ্চা নেই, আমি তো তোমায় হেল্প করতে পারি বড় ভাবী? "
" তা পারো, কিন্তু যদি তাহসিনকে সামলাতে ভালো হতো। ধারা আসলো মাত্র, ও একটু ফ্রেশ হোক। "
" তাহসিন বাবাকে আমরা সামলাচ্ছি আপু। তুমি নিশ্চিন্তে রান্নার আয়োজন করো। "
সৃজান কথাটা বলে। তাদের কথা শেষ হতেই যে যার মতো ঘরে চলে গেলো। সাজিয়া রান্নাঘরে গিয়ে রান্নার আয়োজন শুরু করে। বাজার সদাই সব আসার সময়ই বাজারে গাড়ি থামিয়ে করে নিয়েছে। চুলা জ্বা''লিয়ে ভাতের চাল ধুয়ে বসিয়ে দিতেই সাজিয়ার বড় চাচী রান্নাঘরে হাজির হোন। তাকে দেখেই সাজিয়া সালাম দেয়। উনি সালামের জবাব দিয়ে বলেন,
" কেমন আছো আম্মু? তুমি আসলে অথচ আমরা টেরও পেলাম না। সৃজান না বললে তো জানতামওনন আম্মু। এতটা পর করে দিলে?"
" ব্যাপারটা তেমন নয় বড়আম্মু। সাথে আরও মানুষজন এসেছে তো। তাদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।রান্না শেষ করে সবাইকে নিয়েই ঘুরতে যেতে চেয়েছিলাম।ধারাও পরিক্ষা দিতে গিয়েছিলো, সবাইকে রেখে যেতেও পারছিলাম না।বাসার সবাই কেমন আছে বড় আম্মু?"
সাজিয়ার বাবারা তিনভাই দুইবোন। সাজিয়ার দুই চাচীকে সে বড় আম্মু আর ছোটো আম্মু বলে সম্মোধন করে। সেজন্যই বড় চাচীকে বড় আম্মু ডাকলো সে। সম্পর্কে চাচী হলেও মায়ের অভাব সেভাবে বুঝতে দেয়নি তার দুই চাচী। সেজন্য সম্মানের জায়গা থেকেই চাচী না বলে আম্মু বলেই ডাকে। দুইজন হওয়ায় বড় বর ছোটো বলে ডাকটুকু পৃথক করে তারা তিন ভাইবোন-ই।সাজিয়াদের বাড়ি সাজিয়ার বাবা বড় হওয়ায় সব বাড়ির শুরুতে,তাদের বাড়ি ছাড়িয়ে তাদের চাচাদের বাড়িতে যেতে হয়। সেজন্য সে বাড়ি আসলেও না জানালে কেউ বুঝতে পারেনা সে এসেছে। সাজিয়ার কথা বুঝে তার বড় আম্মু উত্তর দেন,
" সবাই আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে আম্মু। একা এতো আয়োজন করবে কিভাবে? আমি সাহায্য করি তোমার হাতে হাতে। "
কথাটুকু বলেই বাহারী বাজার দেখে সাহায্য করতে বসে যান সাজিয়ার বড় আম্মু। সাজিয়াও হাসিমুখে চাচীর সাথে কাজ করতে শুরু করে।
একথোকা কৃষ্ণচূড়া | আর্শিয়া ইসলাম উর্মি
৬,
নিজের ঘরে বইয়ে মুখ গুঁজে বসে আছে ধারা। তাহসিন সৃজানের কাছে আছে। ধারার ঘরে চেয়ার টেবিলের কাছে চেয়ার পেতে গালে হাত দিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন তাহিরা। ধারাদের বাড়িতে ঘর তিনটা, দুচালা টিনের ঘর বড় একটা।মাঝখানে টিনের পাটিশন দিয়ে তিনটা রুম করা। একটা ধারার,অন্যটা সৃজানের।আর একটায় মানুষ আসলে থাকতে দেওয়া হয়, যেটায় তৃপ্তি লামকে নিয়ে শুয়ে ফিডিং করাতে ব্যস্ত। তাহসিনের বয়স ২বছর আর লামের দেড় বছর। সাজিয়ার বর শহীদ আর তার ভাই সানু একবছরের ছোটো বড় হওয়ায় একসাথেই বিয়ে করে আর তাদের বউয়ের বাচ্চাও হয়েছে প্রায় একসাথে, ছয়মাসের আগপাছ শুধু । তাহিরা ভাইদের ভাবনায় মশগুল থাকতে থাকতেই শ্রাবণ ধারার ঘরের দরজার সামনে দাড়িয়ে তার উদ্দেশ্যে বলে,
" ভাবী একটু বাইরে আসবে? কথা ছিলো। "
তাহিরার শ্রাবণের কথা কানে যেতেই নিশব্দে শরীরে শীতের শালটা জড়িয়ে বেরিয়ে আসে। ধারা সেটা একঝলক দেখেই আবার বইয়ে মুখ গুজে বসে। আগামী কাল-পরশু দুদিন গ্যাপ আছে। সেজন্য সে ঘুমায়নি,পড়তে বসেছে। পড়ে একটু করে এগিয়ে রাখতেই মূলত পড়তে বসা। নয়তো তাহসিন আর লাম এসেছে আর সে বই নিয়ে বসে আছে এমন টা হবার নয়। ধারা যে ভীষণ বাচ্চাপাগলি। সেখানে দুজনই তার ভীষণ প্রিয় আদরের বাচ্চা। ধারার মন টিকছে না বইয়ে । সৃজানের ঘরে গিয়ে তাহসিনকে আনতে ইচ্ছে করছে তার৷ কিন্তু এই শ্রাবণ নামক মানুষকে তার একদম পছন্দ নয়, সেজন্য ঘর থেকে বের হচ্ছে না সে। তাহিরা আপুর বিয়ের দিনই ধারা বুঝে ছিলো লোকটা ভালো নয়। সেজন্য তো কথা বলতে আসলেই বলেছিলো সে তাহসিনের মা। দিনটার কথা মনেও করতে চায় না ধারা। তার বিয়ের আনন্দ টাই মাটি করে দিয়েছিলো লোক-টা।
" আমি যদি ভুল না হই, ধারার জন্যই তুমি এখানে এসেছো। তাইনা ভাইয়া? ধারাকে তো তুমি আমার ফোনে ওর ছবি দেখে জিগাসা করে জেনেছিলে ও বড় ভাবীর বোন। তোমাদের যে তোমার ভাইয়ার আর আমার বিয়ের সময় আলাপ হয়েছিলো এটা তো বলোনি। একটু খোলাখুলি বলবে ভাইয়া আদৎ এ কি হয়েছিলো?"
পুকুর পারে শানের উপর বসে শ্রাবণের উদ্দেশ্যে কথাটুকু বলে তাহিরা। শ্রাবণ তাকে ডেকে নিয়ে ধারাদের পুকুরপারে নিয়ে এসেছে। ধারার বাবা মা*রা গেলেও উনি যে পিতৃ সূত্রে সম্পত্তি পেয়েছিলেন, সেগুলোর জৌলুশ এখনও ধরে রেখেছে উনার তিন সন্তান, সেটা বুঝাই যায় সবকিছুতে। মাছের চাষ করতে নিজস্ব পুকুরও করেছিলেন ধারার বাবা।যেখানে এই মুহুর্তে শ্রাবণ আর তাহিরা উপস্থিত।
" কি হলো ভাইয়া? উত্তর দিচ্ছো না যে? "
শ্রাবণ একের পর এক ছোটো ছোটো মাটির ঢিল পুকুরের পানিতে শূণ্যে ছুড়ছিলো বসে বসে। তাহিরার কথা ফের কানে যেতেই বলে,
" তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক ঘটনা ভাবী। আপাতত আমার এতো কথা বলতে ভালো লাগছেনা। "
" তাহলে ডেকে আনলে কেনো এখানে? "
" এমনিই? আজব তো ভাইয়া। আচ্ছা ধারার জন্যই কি আমার ভাবীদের ঠিকুজি গুস্টি জানতে চেয়েছিলে গল্পের ছলে? আর আজ এখানে আসলে। কিন্তু আজ কেনো? তুমি তো অনেক আগেই জেনেছিলে তাদের ব্যাপারে! "
" আগে জানলেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি ভাবী৷ কিন্তু যখন করলাম, নাম্বারই ব্লক দিলো। "
" মানে? কি বুঝাতে চাইছো ভাইয়া? "
" উনি বুঝাতে চাচ্ছেন উনি আমার কাছে মেসেজ করেছিলেন। আর আমি উনার নাম্বার ব্লক করে দিয়েছি তাহিরা আপু। "
শ্রাবণের সাথে কথার মাঝেই তাহিরার সাথে কথা শেষ হতেই পিছন থেকে ধারা এসে উত্তরটা দেয়। শ্রাবণ নিরলস অভিব্যক্তিতে সেই পুকুরপানেই তাকিয়ে আছে।তাহিরা দুজনকে একঝলক দেখে ধারাকে বলে,
" তুমি তো পড়তে বসে ছিলে? হঠাৎ এখানে? "
" আপু সন্ধ্যার নাস্তা গুছিয়ে ফেলেছে৷ আপনাদের ডাকছে৷ আসুন। "
কথাটা বলেই হনহনিয়ে চলে যায় ধারা। মনের মাঝে একগাদা প্রশ্নের ঝড় থাকলেও তাহিরার সামনে শ্রাবণকে জিগাসা করলো না সে। লোকটার সাথে কথা বলতেও ইচ্ছে করেনা তার৷ বিরক্তিকর মানুষ একজন মনে হয়। ধারা চোখের আড়াল হতেই তাহিরা শ্রাবণকে প্রশ্ন করে,
" একটু ক্লিয়ারলি বলবে ভাইয়া আসলে তোমাদের মাঝে হয়েছে কি? কানেকশন কি? ধারা তোমার প্রতি এতো বিরক্ত কেনো? ওর চাহনী দেখলেই বোঝা যায় সে অনেক বিরক্ত তোমার উপর৷ একটু ক্লিয়ার করো প্লিজ। "
৭,
" তোমার আর ভাইয়ার বিয়ের দিন ধারাকে প্রথম দেখেছিলাম। সেখানে তাকে প্রথম দেখেই তার প্রতি একটা ভালো লাগা-ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। যেটাকে অনেকে লাভ এট ফার্স্ট সাইড বলে আখ্যায়িত করে। আমার কাছে সেসবের গুরুত্ব ছিলো না তেমন। কিন্তু সেদিন ওকে দেখে মনে হয়েছিলো এই মায়াবতীকে ভালোবাসা যায়। ঐ যে কথায় আছে না, ' যাকে ভালো লাগে তার সবকিছুই ভালো লাগে।' সেদিন ধারা বিয়ে বাড়িতে সব ছোটো বাচ্চাদের নিয়ে তোমার বাড়ির উঠোনের এক কোণে আনন্দ উল্লাসে মেতে ছিলো। বাথরুমে গিয়েছিলাম, আমার পান্জাবিতে তরকারির ঝোল লেগেছিলো, সেটা পরিস্কার করতে গিয়ে তাকে দেখি৷ বাচ্চাদের সাথে বাচ্চামি গম্ভীর ভাব সবকিছু মিলিয়ে আমি মোটামুটি রকম ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পরি। আগ বারিয়ে কথা বলতে যেতে ধরি। তখন সৃজান ওর কোলে তাহসিনকে দিয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো সৃজান ওর স্বামী বাচ্চাটা ওর। কিন্তু এতো ছোটো মেয়ের আবার বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা আছে মানতে পারিনি। গিয়ে বলেই বসি, যে লোকটা ওর কাছে বাচ্চা দিয়ে গেলো, সে ওর স্বামী কিনা। রে'গে ও চট করে আমায় থা''প্পড় দিতে হাত উঠিয়ে ফেলে। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে সামলে রা'গী কন্ঠে বলে, কাউকে না জেনে ভুলভাল প্রশ্ন করবেন না৷ আপনি প্রশ্ন টা এভাবেও করতে পারতেন, যে লোকটা কে? আমাদের ভাইবোনকে স্বামী-স্ত্রী ভেবে বসলেন? কিন্তু আমাকে এসব প্রশ্ন করার আপনি কে? আপনাকে তো আমি চিনিও না৷' তার কথা শোনার পর স্যরি বলি৷ ক্ষমা চাই, সে রে'গে ওখান থেকে চলে যেতে ধরে তাহসিনকে নিয়ে৷ পরে পিছ থেকেই বলেছিলাম, লোকটা যেহেতু ভাই হয়! তাহলে বাচ্চাটা কে? ভাইয়ের ছেলে?' সে পিছু না ফিরেই বলে যায় তার ছেলে।"
তাহিরার কথার উত্তরে সবকিছু খুলে বলে শ্রাবণ। তাহিরা শ্রাবণের কথা শেষে গালে হাত দিয়ে বসে পরে৷ ভালোবাসা এভাবেও হয়! শ্রাবণ তখনও পুকুরপানে তাকিয়ে রয়েছে নির্বাক হয়ে। তাহিরা এরপর বলে,
" এজন্য আমার ফোনে যখন ধারার ছবি, তাহসিনের ছবি দেখো আর আমার ১৪গুস্টির সম্পর্কে জানতে বসো তাইনা? "
" ১৪গুস্টি নিয়ে আমার আগ্রহ ছিলো না।ছিলো ধারাকে নিয়ে। সেজন্য তোমার কাছে সবার কথা জানার উছিলায় ধারা কে এটা জানতে চাই। জানার পর খোজ নিয়ে ধারার কাছে ক্ষমা চাওয়ার বাহানায় রোজ ওর কলেজের সামনে যেতাম। সেখান থেকেই ধারা আমায় একটু চিনে। যে জন্য আমায় দেখে তখন ওরকম ভাবে রিয়েক্ট করে। "
শ্রাবণের কথা শুনে এবার তাহিরার মাথায় হাত। এতোকিছু কান্ড ঘটিয়ে বসেছে শ্রাবণ, অথচ সে এখন জানছে। তাহিরা এবার বসা থেকে উঠে শ্রাবণের সামনে দাড়িয়ে বলে,
" দেবরজী? এই আমি তোমার ছোটো বোনের মতো ভাবী? এটাই তো বলো তাইনা? ডু'বে ডু'বে জল খাও! আর পানি নাকেমুখে ঢুকলেই ভাবীকে নিজের সুবিধায় ব্যবহার করো। যাও রাগ করলাম তোমার সাথে। "
" আরে ভাবী তুমি এটুকুতেই রে'গে গেলে যে! আরও ঘটনা বাকি আছে৷ আমি তোমার সাহায্যে এখানে কেনো আসলাম শুনবেনা? "
" কি কারণে? "
শ্রাবণের কথার উত্তরে চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে উত্তর দেয় তাহিরা। শ্রাবণ তাহিরাকে পাশ কা''টিয়ে পুকুরে নামার এক সিড়ির উপর দাড়িয়ে পকেটে হাত গুজে বলতে শুরু করে,
" কলেজের সামনে গিয়ে রোজ যখন ধারাকে ফলো করতে লাগলাম; সে রে''গে একদিন আমার সামনে দাড়িয়ে জিগাসা করে, আমি কে? বিয়ের দিন তাকে দেখার পর কিছুদিন পরথেকে তাকে এভাবে ফলো করছি, সে কে, এই কলেজে পড়ে জানলাম কি করে? এসব প্রশ্নের এসব উত্তর দিতে মুখ খোলার আগেই তা ফ্রেন্ড'স-রা এসে পরে। ওর সাথে মজা করতে বলে আমি ওর বয়ফ্রেন্ড কিনা! আমাকেও জিগাসা করে। আমিও মজার ছলে বলি, ' হ্যাঁ আমিই ওর বয়ফ্রেন্ড। ' এমনিই আমার উপর রে''গে ছিলো। আবার আমার এই কথা আ''গুনে ঘি ঢালার মতো হয়েছিল। অতঃপর বিষয়টা এতোদূর গড়ায় ওর ফ্রেন্ড'স রা ওকে সবসময় আমায় নিয়ে প''চাতো ওকে। যার ফলে ওদের সাথে ধারার ফ্রেন্ডশিপ ভে''ঙে যায়। ধারা কলেজেও যায়না, কয়েকদিন। আমি ঐ ঘটনার প্রায় ৪-৫দিন পর কলেজের সামনে যাই তখন ওর একটা ফ্রেন্ড আমায় দেখে কথাগুলো বলে। পরিক্ষার আর ছিলোই ক'দিন বাকি৷ স্যার -রা দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে সাজেশন ধরিয়ে পড়াচ্ছেন, অথচ সে কলেজে যায়না। কতটা ক্ষ'তি আমি করেছি ভাবো! সেজন্য তোমার ফোন থেকে ওর নাম্বার নিয়ে মেসেজ দিই, আর সেখানও ব্লক খাই। ও না জেনেই আমায় ব্লক করে দিয়েছে। "
" মেসেজগুলো আপনি দিয়েছেন আইডিয়া ছিলো না। তবে ব্ল'ক করেছি যখন নিশ্চিত থাকুন সে ব্ল'ক আর খুলবেনা।"
৮,
আবারও কথার মাঝে ধারার কন্ঠস্বর পেয়ে পেছন ফিরে তাকায় শ্রাবণ আর তাহিরা। টর্চ হাতে পুকুর থেকে একটু উঁচুতে দাড়িয়ে আছে ধারা।তাকে দেখে তাহিরা বলে উঠে,
" আবার আসলে যে? শ্রাবণের সব কথা শুনে নিয়েছো?"
" কারোর কথা আড়ি পেতে শোনার ইচ্ছে বা রুচি কোনোটাই আমার নেই বুবু৷ রাত হয়ে আসছে, একবার ডেকে গেলাম, আসলে না। তাই সাজিয়া বুবু তোমাদের নিতে পাঠালো। চিন্তা নেই, আমি শুধু উনিই আমায় মেসেজ দিয়েছিলেন এটুকু কানে উড়ো কথার মতো ভেসে এসে পরেছে। বাকি কিছু আমি শুনিনি। তোমরা কি এবার যাবে আমার সাথে? রাতের আধার নেমে গেছে, পুকুরপারে থাকা বি''পদের। কখন কি এসে কা''মড়ে দেয় কে জানে। "
ধারা কথাটুকু বলে পিছু ফিরে হাটা ধরে বাড়ির দিকে। তার পিছু শ্রাবণ আর তাহিরাও হাফ ছেড়ে নিশ্বাস নিয়ে বাড়ির দিকে যায়। যেতে যেতেই তাহিরা শ্রাবণের উদ্দেশ্যে বিরবির করে বলে,
" দুনিয়ায় মেয়ে পাওনি ভাই? এই ধা''নিলঙ্কাকেই পছন্দ করতে হলো! দেখো তার ঝাঁজে না পু'"ড়িয়ে দেয়। "
শ্রাবণ তার ভাবীর কথায় শুধু মুচকি হাসলো কিছু বললো না৷
ওরা বাড়িতে ফিরতেই সাজিয়া একটু ব''কাঝকা করে খেতে বসিয়ে দিলো বারান্দায় লম্বা করে পাটি পেরে। চেয়ার টেবিলে সবাইকে আটবেনা বলে।ওরা মানুষজন কম,কোনোরকম ৪জন বসে খেতে পারবে এমন চেয়ার টেবিল কিনে রেখেছে, কিন্তু এখন মানুষ বেশি। গ্রামের বাড়ি, সন্ধ্যা ৭টাই এই শীতের সময় মাঝরাতের মতো। সাজিয়ার বড় আম্মু আর ছোটো আম্মু সবাইকে বেড়ে খাওয়াতে সাহায্য করছে তাকে। ধারা তরকারির বাটি এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে তাদের দিকে। সাজিয়া এতোক্ষণ ব্যস্ত থাকায় তাহসিনের দিকে নজর দিতে পারেনি।সেজন্য এখন একটু তাকে খাওয়াতে বসেছে। তৃপ্তি লামকে খাইয়ে ঘুম পারিয়ে এসে বসলো খেতে সবার শেষে। গ্রামের তাজা সবজি আর মাছের তরকারি, দেশি মুরগীর ঝোল সামান্য আয়োজনেই সবাই তৃপ্তি সহাকরে খাচ্ছে। সাজিয়া এক নজরে সবাইকে দেখে নিলো। সবাই অনেক টা উপভোগ করছে, খুশি হয়েছে এই ব্যাপারগুলোয়, ভালো লাগছে তার সবাইকে খুশি খুশি দেখে। ইট পাথরের শহরের দমবন্ধকর পরিবেশ থেকে বেরিয়ে গ্রামের এই সতেজতায় যেনো সবাই মন মাতিয়ে আনন্দ করছে এসে থেকে, ভাবতেই ভালো লাগছে সাজিয়ার। ইশ যদি থেকে যাওয়া যেতো গ্রামে একেবারে! সবার খাওয়া শেষে প্রায় সাজিয়া তাহসিনকে সৃজানের কাছে দিয়ে বোন আর চাচীদের নিয়ে খেতে বসলো। তারা চলে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সাজিয়া যেতে দিলো না। দুই চাচীরই তার একজন ছেলে একজন মেয়ে, বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা তার চাচাতো ভাইয়েরা আর বোনদেরও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তাই চাচীদের সাথে নিয়ে খাওয়া শেষে চাচাদের জন্য খাবার গুছিয়ে দিলো সাজিয়া আর ধারা। উনারা চলে যেতেই দুবোনে ঝটপট সব থালাবাসন ধুয়ে নিয়ে সবার জন্য বিছানা ঠিক করে দিতে গেলো। তিনঘর ঠিক করা হলো সৃজানের সাথে শ্রাবণ থাকবে। সাজিয়া আর তৃপ্তি বাচ্চাদের নিয়ে তার একঘরে,তাহিরা আর ধারা তার ঘরে থাকবে। বিছানা তৈরি করে সাজিয়া যখন ঘরে যাচ্ছিলো, শ্রাবণ বারান্দায় থামিয়ে সাজিয়ার উদ্দেশ্যে বলে,
" ভাবী আপনার কাছে একটা আবদার ছিলো! "
সাজিয়া অবাক নয়নে শ্রাবণের কথার উত্তরে বলে,
" কি আবদার? "
ধারাও সেই সময় নিজের ঘরের দরজার সামনে দাড়িয়ে শ্রাবণের কথা শুনেছে। এই লোক আবার কি চায়? চি'ন্তা ধরে যায় ধারার। আবার উল্টোপাল্টা কিছু বলবে না তো তাকে ঘিরে। এমন যদি হয় শ্রাবণকে যাচ্ছেতাই ভাবে অ''পমান করবে সে। এমনটাই মনে মনে ভেবে নেয় ধারা। কিন্তু তার ধারণাকে মি'থ্যে প্রমাণ করে শ্রাবণ সাজিয়াকে বলে,
ধারাবাহিক উপন্যাস | একথোকা কৃষ্ণচূড়া | আর্শিয়া ইসলাম উর্মি
৯,
" আসলে ভাবী আমি বিয়ে করবো ভাবছিলাম। আপনাদের গ্রাম টা অনেক সুন্দর। আপনাদের গ্রামেই আমার জন্য উপযুক্ত মেয়ে আছে কিনা একটু দেখুন তো খুজে। "
শ্রাবণের কথায় পুরো ভ্যা"বা''চে'কা খেয়ে যায় সাজিয়া। ছেলের পড়াশোনা শেষ হয়নি, চাকরির খবর নেই। সে করবে বিয়ে আশ্চর্য! ওদিকে ধারাও কেমন সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আছে শ্রাবণের দিকে। ঘুরিয়ে পেচিয়ে কি তার বোনের কাছে তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিচ্ছে না তো শ্রাবণ? একটুপর সাজিয়া হতবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
" তুমি সিরিয়াস শ্রাবণ?"
" হ্যাঁ ভাবী আমি সিরিয়াস। "
" কিন্তু তোমার কথাবার্তা কেমন খামখেয়ালি লাগছে আমার কাছে। "
" কেনো ভাবী?"
" তোমার পড়াশোনা শেষ হয়নি এখনও। চাকরিও তো করছোনা তুমি। "
" রিযিকের মালিক উপরওয়ালা ভাবী। চিন্তা করিয়েন না।আমি বিয়ে করবো এটাই ফাইনাল। আপনি বউ খুজে দেন।"
" বললেই কি বউ পাওয়া যায়? এভাবে কিভাবে বউ পাওয়া সম্ভব? "
" তাহলে কিভাবে সম্ভব ভাবী? "
" ঘটক লাগিয়ে খুজতে হবে। মেয়ের খোজ ঘটকদের ভালো জানা থাকে। "
সাজিয়ার এই কথায় শ্রাবণ সোজাসুজি ধারার দিকে তাকায়। সে আগেই খেয়াল করেছে ধারা দাড়িয়ে তাদের কথা শুনছে। সে ধারার দিকে তাকাতেই ধারা চট করে ঘরের ভেতরে চলে যায়। সাজিয়া শ্রাবণের চাহনী লক্ষ্য করে পিছন ফিরে দেখে। কিন্তু কিছু দেখতে না পেয়ে শ্রাবণকে ফের প্রশ্ন করে,
" কি হলো কিছু বলছো না যে? "
" ঘটককে বলার দরকার কি ভাবী? ঘরেই তো মেয়ে আছে। "
" মানে কি বলছো তুমি? কে আছে? "
আনমনা হয়ে শ্রাবণ কথাটা বলে ফেলে। সাজিয়ার প্রশ্নে সে মনে মনে নিজেকে নিজেই ধ'মক দিয়ে হেসে উত্তর দেয়,
" না কেউ না ভাবী৷ যান ঘুমিয়ে পরুন। অনেক রাত হয়েছে। "
কথাটা বলেই শ্রাবণ হনহনিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। এমনিই শীতের দিন গ্রামে যেনো আরও শীত বেশি। সাজিয়া শ্রাবণের এহেন কান্ডে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ওখানেই দাড়িয়ে থেকে ঘরের দিকে চলে যায়। যেতে যেতে ভাবে এই শ্রাবণ ছেলেটাই কেমন যেনো।অদ্ভুত রকম, কোনো কথার আগামাথা থাকেনা। প্রতিটা কথায় কেমন রহস্য লুকিয়ে যায়৷ ঘরে গিয়ে ঘুমন্ত ছেলের পাশে শুয়ে পরে সাজিয়া।
এদিকে ঘরে ঢুকেই ধারা চুপচাপ পড়ার টেবিলে বই খুলে মুখ গুজে চোখ বন্ধ করে আছে। শরীরে পরে থাকা শাল চাদরের একপাশ মাটিতে গড়াগড়ি করছে। শরীরে শীতের জ্যাকেট যেনো অসম্ভব রকম ভারী লাগছে তার। তবুও ঝিম মে*রে ওভাবেই বসে আছে সে। এই শ্রাবণের কর্মকান্ড তার যথেষ্ট বি'রক্তির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। এতোদিন কলেজের সামনে আর এখন সোজা বাড়িতে৷ চায় কি এই ছেলেটা! মাথায় ঢুকছেনা ধারার। জীবনের বি'রক্তির একটা অধ্যায় এখন এই শ্রাবণ নামক ব্যক্তি হয়ে দাড়িয়েছে।
" কি হলো ধারা? ওভাবে বসে আছো। ঘুমোবেনা? "
ধারাকে টেবিলে ওভাবে বইয়ে মুখ গুজে শুয়ে থাকতে দেখে শুয়ে থেকেই প্রশ্নটা করে তাহিরা। এতোক্ষণ স্বামীর সাথে কথা বলছিলো সে মেসেজে। রাতের বেলা, অন্য কারোর ঘরে ফোনে কথা বলে বি'রক্ত করতে চায়নি সে,যার দরুণ মেসেজেই কথা বললো। কথা বলা শেষে প্রশ্নটা করে সে। ধারা তখনও নিরুত্তর। অপ্রোয়জনে কথা বলতে তার ভালো লাগেনা। আবার সে সবার সাথে মিশতেও পারেনা। এটা তার দো'ষ নাকি তার কপালের বুঝে আসেনা ধারার। একটা কথা মনে হতেই নিজের কপাল চা'পড়াতে ইচ্ছে করছে তার। কেনো যে সে তাহিরার জোড়াজুড়িতে তার ফোনে ছবি তুলেছিলো আর তাহিরার কাছে তার নাম্বার রয়ে গেছিলো। নয়তো শ্রাবণ নামক এই বি'রক্তির অধ্যায়ের সূচনা তার জীবনে আসতো না।
" কি হলো? কথা উত্তরও দিচ্ছো না,শুয়েও পরছোনা? যতদূর জানি তোমার কয়েকদিন গ্যাপ আছে পরবর্তী পরিক্ষার আগে। এভাবে ঠান্ডার ভিতর বসে না থেকে শুয়ে পরো। "
তাহিরার ফের কথায় কিছু বললো না ধারা। উঠে দাড়িয়ে বই বন্ধ করে গুছিয়ে রেখে সে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পরে। তাহিরা ধারার এই আচরণে কিছু মনে করতে চেয়েও করলো না।সে জানে ধারা এমনই চুপচাপ স্বভাবের৷ তার মাঝে তার দেবরের কর্মে নিজেই কেমন লজ্জিত বোধ করছে ধারার কাছে।তাই তাকে আর কিছু না বলে ঘুমানোর চেষ্টা করলো।
১০,
পরদিন সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠার পর শ্রাবণের দুইচোখ ধারাকেই খুজে চলেছে। উঠোনে সবাই আছে। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হচ্ছে। কিন্তু ধারার চিহ্ন কোথাও নেই। শ্রাবণের এরকম উৎকন্ঠা দেখে তাহিরা ব্রাশ করতে করতে তার দেবরের দিকে এগিয়ে এসে শ্রাবণের পাশে দাড়িয়ে বলে,
" যাকে খুজছো সে তার বড় আম্মুর বাড়িতে। আমাদের সকালের খাবারের আয়োজন উনারা করেছেন। তাই ধারা সেখানে গিয়ে সব গুছিয়ে এগিয়ে দিতে গেছে। ফ্রেশ হও। আমাদের সাথে চলো, দেখা পাবে। "
তাহিরার কথায় শ্রাবণ মাথা চুলকে হেসে সৃজানের কাছে যায় লুঙ্গিরজন্য। সে তো তেমন কাপড় আনেনি, তাই লুঙ্গি পরে একেবারে গোসল দিয়েই ফ্রেশ হয়ে নেবে।
" ভাবী শ্রাবণের মতিগতি আপনার কাছে কি করো ঠিকঠাক লাগছে? কেমন একটা চো'রা চো'রা ভাব তারমাঝে। খেয়াল করেছেন আপনি? "
তাহসিনকে মুখ ধুইয়ে দিচ্ছিলো সাজিয়া। এরমাঝে তৃপ্তি তার পাশে দাড়িয়ে ফিসফিসিয়ে কথাগুলো বলে তাকে৷ তৃপ্তির কথা যে ভুল এমনটা না, সেটা রাতেও ভেবে দেখেছে সে। হুটহাট গ্রামে আসতে চাওয়া, আবার বিয়ের কথা বলা কেমন একটা গোল মেলে ব্যাপার লাগছে তার কাছে। তৃপ্তির দিকে তাকালো সাজিয়া৷ তৃপ্তি কথাটুকু বলে লামকে কোলে নিয়ে চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে আছে তার উত্তরের প্রত্যাশায়। সাজিয়া তৃপ্তির কথার মানে বুঝলেও উত্তর দিলো,
" এসব নিয়ে ভাবিও না তৃপ্তি। তাহিরার দেবর, নতুন আত্মীয়। তার আচার আচরণে স'ন্দেহ করছি কোনোভাবে জানলে কি ভাববে বলো তো! চলো লাম বাবুকে ফিডিং করিয়ে নাও। বড় আম্মুদের বাসায় আবার খেতে বসে তাকে আর খাওয়ানোর সুযোগ পাবে না। "
কথাটা বলেই সাজিয়া তৃপ্তিকে পাশ কা'টিয়ে ঘরে গেলো। তৃপ্তিও বড় জা-য়ের কথা শুনে পিছু পিছু ঘরে চলে গেলো।
সৃজান আর শ্রাবণ দুজনই একসঙ্গে সৃজানদের পুকুর থেকে গোসল দিয়ে উঠেছে। একে তো শীতে কুয়াশায় চারদিকে কিছু দেখা যাচ্ছে না সকাল সকাল। তারমাঝে গোসল। দুজনে কা'পতে কা'পতে ঘরে আসলো। পানির ভিতর থাকার সময় এতোটা শীত লাগেনি, যতটা উঠে এসে লাগছে। শীতের কাপড় পরতে পরতে শ্রাবণ সৃজানকে বলে,
" আচ্ছা তোমার এই দুটো বোনই দেখি গম্ভীর স্বভাবের আর তুমি চঞ্চল, ঠিক আমার মতো। কিন্তু তারা এমন গম্ভীর কেনো বলো তো! "
" বড় আপু গম্ভীর নয়, হাসিখুশিই আছে। কিন্তু বিয়ের পর একটু কেমন পাল্টে গেছে। কথাবার্তা আগের তুলনায় কম বলে। কিন্তু ধারা আগে থেকেই এমন, রা'গ আর গম্ভীরতা যেনো তার ভাত তরকারি। যেগুলো ছাড়া জীবন চলে না।"
সৃজানের উত্তরে শব্দ করে হাসলো শ্রাবণ। সৃজান তা দেখে আবার বললো,
" তুমি হাসছো শ্রাবণ ভাই! "
" তাহলে কি করবো বলো? "
" এই দুই গম্ভীর বোনের জন্য আমায় যে এতো চুপচাপ ভদ্র হয়ে মেপেজোকে কথা বলতে হয়! সেই কষ্টে কষ্ট পাও আমার সাথে। "
" তুমি প্রচুর মজার মানুষ সৃজান। আচ্ছা বড় আপুর ব্যাপারটা না হয় বুঝলাম। কিন্তু ধারা! সে তো ছোটো। সে এমন গম্ভীর কেনো বলো তো? কিছু বলা যায় না,বললে হয় এড়িয়ে যায় নয়তো রে'গে যায়। "
" কারণ আছে কিছু । মূলত আম্মুর বিষয় নিয়ে পে'ত্নী অনেক গম্ভীর। "
কথাটা বলেই মন খারাপের রেশ দেখা দিলো সৃজানের মুখে। শ্রাবণ কথাটার মানে বুঝলো না। সে আগ্রহের সহিত প্রশ্ন করলো,
" পে'ত্নী টা কি ধারা? তাকে পে'ত্নী বলো তুমি? আর আম্মু? বুঝলাম না ব্যাপারটা! "
শ্রাবণের কথা শেষ হতেই সাজিয়া দরজার সামনে এসে দাড়ায়। দুজনকেই দাড়িয়ে থাকতে দেখে বলে,
" তোমাদের কি সকালের খাবার খেতে হবে না? চাচীরা বসে আছেন আমাদের জন্য। চলো তাড়াতাড়ি। "
সাজিয়ার কথায় দুজনই দরজার দিকে তাকায়। শ্রাবণ কিছু টা হ'তাশ হয়। তার আর কিছু জানা হবে না এখন। সৃজান বড় বোনের কথায় চটপট রেডি হয়ে বের হয়। শ্রাবণও পিছুপিছু আসে। উঠোনে পা দিতেই গেট দিয়ে একজনকে ঢুকতে দেখে সাজিয়া। তৃপ্তি লামকে নিয়ে আগেই উঠোনে ছিলো। মানুষ টাকে দেখে সাজিয়া থমকে দাড়ায়। তাহসিনকে সৃজানের কোলে দিয়ে মানুষটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
" আপনি? আবার এসেছেন?"
অনেকটা রেগে জোড়ে কথাটা বলে। উঠোনে বাকি সবাই সাজিয়া আর মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে। তাহিরা আর তৃপ্তি সৃজানের কাছে দাড়িয়ে একসাথেই বলে,
" উনি কে সৃজান? ভাবী এতো রেগে গেলো কেনো উনাকে দেখে?
১১,
" আপনারা অনেকে বলেন না ধারা এতো রা'গী আর ব'দমে'জাজী কেনো! এই মানুষ টা হলো ধারার এতো বে'পরোয়া স্বভাবের। কারোর গুরুত্ব নেই ওর কাছে শুধু এই মানুষ টার জন্য। "
সৃজানের উত্তরে তাহিরা,তৃপ্তি আর শ্রাবণ তিনজনেই আশ্চর্য হয়ে তাকায় সৃজানের দিকে। শ্রাবণ কাপা গলায় উত্তর দেয়,
" কে এই মহিলা? সেটা তো বলো সৃজান। "
"উনি আমাদের মা। অবশ্য উনাকে মা বলা যায় কি না সন্দেহ। "
সৃজানের উত্তর ফের একদফা অবাক হয় শ্রাবণ,তাহিরা,তৃপ্তি। ওরা যতদূর জানে সাজিয়ার বাবা মা'রা যাওয়ার আগে আগে ওদের মা তাকে তা'লাক দিয়ে চলে গিয়েছে। পরে আবার অন্য জায়গায় বিয়ে করেছেন উনি। কিন্তু তার জন্য ধারার উনার কারণে এত বেপ'রোয়া স্বভাবের হওয়ার কি যুক্তি, বুঝতে পারছেনা সবাই। সাজিয়া ঐদিকে তার মায়ের সাথে চি'ৎকার চেঁ'চামেচি করে হাত ধরে গেটের বাইরে দাড় করিয়ে দেয়। তখনই ধারাকে গেটের কাছে দেখতে পায় সবাই। ধারা হাত মুষ্টিমেয় করে চোখ বন্ধ করে দাড়িয়ে আছে বোন আর মায়ের মাঝখানে। সৃজান ধারাকে দেখে ভ'য় পেয়ে যায়। আবার না কোনো অ'ঘ'টন ঘটায় তাদের মা-কে দেখে। সে তাহসিনকে তাহিয়া কোলে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে ধারাকে জড়িয়ে ধরে বুকের ভেতর জাপ্টে নিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে। ধারা ইতিমধ্যে রা'গে কাপছে। চোখ দিয়ে তার জল গড়িয়ে পরছে। শ্রাবণ শুধু একবার ধারার দিকে তাকিয়ে দেখলো তাকে। ধারার এই অবস্থা দেখে ভেতর থেকে দুম'ড়েমু'চড়ে যাচ্ছে শ্রাবণ। যতোই ধারা তাকে স'হ্য করতে না পারুক সে তো ভালোবাসে ধারাকে। সেখানে ভালোবাসার মানুষের চোখের পানি স'হ্য করা অনেক কঠিন। তাহিরা দেবরের করুণ চাহনী লক্ষ্য করে শ্রাবণের পাশে এসে দাড়ায়। একহাতে তাহসিনকে ধরে শ্রাবণের কাধে আরেক হাত রেখে ভরসা দেয়। এরপর সেও হাঁটা ধরে ধারার ঘরের দিকে। আর এদিকে শ্রাবণ আর তৃপ্তি সাজিয়ার কাছে যায়। সাজিয়াও কাঁদছে গেইটের সাথে হেলান দিয়ে মাটিতে বসে পরেছে সে। তাদের মা উনারও চোখে অঝরে অশ্রু ঝ'ড়ছে। তৃপ্তি লামকে একপাশে দাড় করিয়ে সাজিয়ার কাছে বসে জড়িয়ে ধরে সাজিয়াকে। বিয়ে হয়ে একসাথেই শ্বশুড় বাড়িতে ঢুকেছে তারা। কিন্তু এতোদিনেও তার জা-কে সে এতোটা ভে'ঙে পরতে দেখেনি। সবসময় বড় বোনের মতো তাকে ঠিক ভুল শিখিয়ে সংসার গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এভাবে কাদতে দেখেনি। সাজিয়ার এই অবস্থা দেখে শ্রাবণ সাজিয়ার মায়ের সামনে গিয়ে বলে,
" দেখুন জানিনা আপনার সাথে আপনার সন্তানদের সম্পর্ক ঠিক কেমন। তবে এটুকু বুঝেছি সম্পর্ক টা বাকি ১০টা মা সন্তানের সম্পর্কের মতো স্বাভাবিক নয়। তাই অনুরোধ করছি আপনি এই মুহুর্তে চলে যান। দেখছেন তো আপনাকে দেখে সবাই কতটা হাইপার হয়ে গিয়েছে, কাঁদছে। তবুও আপনি মুর্তির মতো এখানে দাড়িয়ে আছেন। অদ্ভুত মানুষ তো আপনি। "
শ্রাবণের কথায় সাজিয়ার মা মাথা নিচু করে আরও জোড়ে কান্না করায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। সাজিয়া এই অবস্থা দেখে নিজেকে সামলে নিয়ে তৃপ্তিকে মুচকি হেসে উঠে দাড়াতে বলে। তৃপ্তি উঠে দাড়াতেই সাজিয়াও উঠে দাড়ায়। নিজের কাপড় ঝেড়ে নিয়ে তার মায়ের সামনে দাড়িয়ে কাঠগলায় বলে,
" অনেক সহ্য করেছি আপনার এই ন্যাকামি, আমাদের প্রতি মিথ্যা ভালোবাসার নাটক৷ যদি সত্য ভালোবাসতেন আমার বাবাকে ম'র'ণ শয্যায় রেখে আপনি তা''লাক দিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় বিয়ে করতেন না। তারপর আর সন্তান হলো না বলে আপনার মাতৃ সত্তা জেগে উঠে। আর আপনি বারবার এসে আমাদের ভে'ঙে গু'ড়িয়ে দিতে আসেন। ১২বছর হয়ে গেছে বাবা চলে যাওয়ার। এরমাঝে আপনার ১২বার আমাদের কাছে আসা হয়ে গিয়েছে। আপনি একবার করে আসেন আর আমাদের মানসিক শক্তি দুর্বল করে দিয়ে চলে যান। আপনি জানেনই আপনাকে আমাদের সহ্য হয়না। তবুও প্রতিবার আপনি বছরের শেষ দিকে আসেন আর চলে যান। চলে যেতে হয় আপনাকে। তবুও আপনি আসেন। তারমাঝে ধারার কতবড় ক্ষ'তি আপনি করেছেন সেটাও ভালোমতো মনে আছে আমার। হাতজোড় করি আর আসবেন না আমাদের জীবনে। এখন কি আপনার পায়ে পরবো কথাটা রাখার জন্য। এটাই তো বাকি আছে তাইনা? "
সাজিয়ার কথা ফুরোতেই তার মা হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে গায়ের শাল চাদর টা ভালোমতো গায়ে জড়িয়ে আবার যেভাবে এসেছিলেন,সেই ভাবে চলে গেলেন। সাজিয়া হাফছেড়ে দাড়াতেই ধারার কথা মনে হলো তার। তৃপ্তির দিকে তাকিয়ে বললো,
" ধারা কোথায়? "
"সৃজান ভাই ঘরে নিয়ে গিয়েছে। "
তৃপ্তির ছোট্ট উত্তর। সাজিয়া শ্রাবণ আর তৃপ্তিকে সাথে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকলো।
১২,
বেলা গড়িয়ে এখন সময় টা বিকেল। সবাই মিলে আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের বাঙালি নদীর ধারে এসে পরেছে। নদীর ধারে দাড়িয়ে গ্রামে ভ''য়ংক'র সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত। নদীর ধারে আসতে হলে গ্রামের বড় ফসলী জমিগুলো পেরিয়ে আসতে হয়। মাঠে সোনার ফসল ধান, সর্ষে, ভট্টা, আখ, নানান রকমের শীতকালীন সবজি আর নদীর ধারে ১০-১২বছর বয়সী বাচ্চা ছেলেরা বড়শী ফেলে মাছ ধরছে। বড়শীতে ভাত গেঁথে ছোটো ছোটো পুটি ধরছে তারা নদী থেকে। শ্রাবণ,তাহিরা,তৃপ্তি,সৃজান,সাজিয়া এবং ধারা সবাই একসার হয়ে দাড়িয়ে এগুলোই দেখে যাচ্ছে। লাম আর তাহসিনকে সাজিয় তার বড় আম্মু আর ছোটো আম্মুর কাছে দিয়ে এসেছে। বাইরে এই ঠান্ডা বাতাসের মাঝে আনেনি বাচ্চা দুটোকে। দুজনকেই ঘুম পারিয়ে রেখে এসেছে সাজিয়া আর তৃপ্তি। ওরা ঘুম থেকে উঠলে সাজিয়া তার বড় আম্মুকে বলে এসেছে যেনো একটা কল দেয়। বাচ্চা দুটো এতোটাও বড় নয় যে ঘুম থেকে উঠে মায়েদের না দেখলে কাদবেনা। হাড়কাঁপানো শীত আর এই ফসলের মাঠ জুড়ে হলুদ সবুজের সমারোহ পরিবেশ আবহাওয়াটা উপভোগ করার মতো। কিন্তু শ্রাবণ থম মে'রে দাড়িয়ে আছে। সকালের ঘটনাগুলো, সাজিয়ার তার মা-কে বলা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়। সকালে তারা একসাথে ধারা কাছে গিয়ে দেখেছে সৃজান তাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে দিয়েছে। ধারার তার মা-কে দেখে এতোটাই হাইপার হওয়ার মতো কি ব্যাপার হয়েছে অতীতে যে তাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে শান্ত করতে হয়! তাহিরা শ্রাবণকে এরকম নিশ্চুপ হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে তার পাশে দাড়িয়ে বলে,
" চঞ্চল মানুষ যার গ্রাম দেখার এতো ইচ্ছে, এতো আগ্রহ সে এরকম চুপচাপ দাড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা ঠিক হজম হচ্ছে না শ্রাবণ ভাইয়া। "
" ব্যাপার তেমন কিছু নয় ভাবী। "
" তাহলে কেমন কিছু ভাইয়া? "
" সকালে তুমি তো চলে গিয়েছিলে ধারার কাছে। এরপর সাজিয়া ভাবী ওনাদের মা-কে কিছু কথা বলেছে। সেগুলো ঠিক মাথায় ঢুকছেনা আর মাথা থেকে যাচ্ছেও না। "
" কি বলেছিলো বড় ভাবী? "
তাহিরার কথার উত্তরে শ্রাবণ সাজিয়ার বলা সব কথা তাহিরাকে বলে। তাদের দিকে লক্ষ্য করে তৃপ্তি তখন বলে উঠে,
" এই তোমরা ভাবী-দেবর কি ফিসফিস করছো বলো তো? অনেকক্ষণ হলো খেয়াল করেছি তোমরা গল্প করেই যাচ্ছো করেই যাচ্ছো। আমাদের কিছুই বলছো না?"
তৃপ্তির কথায় হালকা হাসে শ্রাবণ। এরপর হাসিমুখেই উত্তর দেয়,
" তেমন কোনো কথা নয় ছোটো ভাবী। ঐ আর কি এই গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করবো, সেটাই ভাবীকে বলছিলাম। "
সবাই শ্রাবণের কথায় হাসে। ছেলেটা অতিরিক্ত চঞ্চল, যার ফলে কোনো কথাই তার মুখে আটকায় না।নিজের বিয়ের কথা নিজেই বলে। এদিকে শ্রাবণ সস্তি পায়। ধারাকে নিয়ে কথা বলছিলো সে আর তাহিরা এবং ধারাকে ঘিরেই তার চিন্তা ভাবনা এটা প্রকাশ করলে সাজিয়া বিষয়টা ভালো ভাবে নিতো না। সেজন্য সে সবার কাছে চেপে গেলো বিষয়টা। ধারা একটু বাকা চোখে তাকে দেখছে এই ব্যাপারটাও সে খেয়াল করেছে। শ্রাবণ দেখেও না দেখার মতো নদীর স্বচ্ছ পানির দিকে দৃষ্টিপাত করলো।সৃজান তাদের নিজেদের জমিগুলো পরিদর্শন করে নিচ্ছে। তাদের জমি সব তাদের চাচারা আবাদ করে। পরে ভাগ করে নেওয়া হয়। কেমন আবাদ হয়েছে এটাই দেখছে সে ঘুরেফিরে। দেখা শেষে সবার কাছে এসে দাড়ালে সাজিয়া বাড়ি যাওয়ার তাড়া দেয়। তাহসিন আর লাম বাড়িতে আছে। উঠে তাদের না দেখলে যে কাঁদবে এটা বলেই সে আগে আগে যেতে থাকে। তার পিছু পিছু সবাই যাচ্ছে। সবার আগে সৃজান,এরপর সাজিয়া,তার পিছনে তৃপ্তি, তার পিছনেধারা, তার পিছনে তাহিরা এরপর শ্রাবণ। ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটতে হয়, সেজন্য পাশাপাশি দুজন যাওয়া যাচ্ছে না। শ্রাবণ তাহিরাকে ফিসফিসিয়ে ডেকে ধারা আগে যেতে বলে। তাহিরাও সেই কথামতো ধানের ক্ষেতে নেমে চট করে ধারার সামনে চলে যায়। ধারা একটু ভ্রু কুঁচকে তাহিরাকে দেখে সে আপনমনে আগের মতো হাটতে থাকে। এরমাঝেই কানের কাছে কারোর ফিসফিসিয়ে কথা বলার শব্দ পায়। পিছ ফিরে দেখে শ্রাবণ। সে রাতের বেলা একবার পুকুরপারে আসতে বলছে সবার ঘুমানোর শেষে। ধারা কথাটা শুনে দাড়িয়ে রা'গী চাহনীতে তাকিয়ে শ্রাবণের মতো আস্তেই বলে,
" আপনার কথা কেনো শুনবো আমি? আপনাকে আমার সহ্য হয়না জানেন না?"
" ধারা প্লিজ, জাস্ট একটা কথা রাখেন। প্লিজ আসিয়েন, আমি কখন
আসতে হয় মেসেজ করে দিবো। "
" কিন্তু কি কারণে যাবো? "
" আসলেই বুঝতে পারবেন। "
ধারা আর কথা বাড়ালো না, এই লোককে আজ বুঝানো দরকার তার কোনো গুরুত্ব ধারার জীবনে নেই। এই ভেবে সে চুপ হয়ে গেলো। কিন্তু রাতের বেলা পুকুরপাড়ে যাওয়া ঠিক হবে তো? চিন্তায় পরে গেলো ধারা।
পর্ব - ১+২+৩+৪+৫+৬ ( বাকি পর্ব গুলোর জন্য আমাদের সাথেই থাকুন।





No comments