Header Ads

Header ADS

নারীর রূপকথা - দোলনা বড়ুয়া তৃষা

নারীর রূপকথা

দোলনা বড়ুয়া তৃষা





প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য তন্নিকে ডাকে ওর বাবা আজিজ সাহেব। 

ছোটবেলা থেকে মেয়েকে ঘুম থেকে তোলা উনার প্রিয় কাজ। অফিসের জন্য পরিপাটি হয়ে রেডি হয়ে মেয়ের রুমে গিয়ে বড় আদর দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে তুলেন। অনেক সময় মেয়ে এত আলসেমি করে । ঘুম ঘুম চোখে মেয়েকে অনেকটা ঠেলে নিয়ে গিয়ে ব্রাশ করিয়ে মুখ ধুয়ে দেয়। 

এই নিয়ে তন্নি দাদী প্রায়শ চেঁচামেচি করে।

- এত বড় মেয়েকে এত আদর দিলে এই মেয়ে তো শ্বশুর বাড়ি তে কথা শোনাবে৷ 

তন্নির মা ও চেঁচিয়ে বলে, মেয়েকে এত সময় নিয়ে সোহাগ করে না তুলে তমাল কেও একটু রেডি করলে তো পার।

মাঝেমধ্যে তন্নির মা আলতো স্বরে বলে, 

- মেয়ে বড় হচ্ছে, এমন হুটহাট রুমে যেও না মেয়ের। 

আজিজ সাহেব আলতো হাসেন মেয়ে তো বুকে ঘুমাতো এই তো বছর খানিক আগেরেই কথা। 

এখনো যেকোন আবদারে কেমন করে বুকে উপর ঝাপিয়ে পড়ে মেয়ে। দুইদিকে ঝুটি করিয়ে এখনো হাত ধরে রাস্তা পার করে স্কুলের গেইটে ঢুকিয়ে দেন মেয়েকে। যতক্ষন দেখা যায় মাঠ পার হয়ে বিল্ডিং এ ঢুকছে ততক্ষন তাকিয়ে থাকেন। 

মেয়ে বড় হচ্ছে এই কথা উনি মানতে নারাজ। আনতেও পারে না মাথায়।  

কেমনে আনবে? এখনো তো পিচ্ছিই মেয়ে তার। সবে সেভেনে উঠলো। 

আজ তন্নির রুমে ঢুকতেই দেখলেন তন্নি উঠে গেলো৷ 

আজিজ সাহেব হাসি হাসি মুখ নিয়ে বললেন, 

- আমার বুড়িটা আজ উঠে গেল যে? এক্সাম আছে নাকি? নাকি খিদে পেয়েছে?  

তাই তো বললাম, রাতে বেশি বেশি খা। একটুকরো মাংস দিয়ে ভাত খেলে হয়?  

বলতে বলতে বিছানার উপর পড়ে থাকা পাতলা কম্বল টা টান দিলেন ভাজ করার জন্য। 

তন্নি তাড়াতাড়ি এসে ধরে ফেলল, 

- না না আব্বু, তোমাকে করতে হবে না। আমি করে নেব। 

একটু অন্যরকম শোনালো। তারপর হেসে মেয়ের দিকে তাকালেন আজিজ সাহেব। 

কেমন যেন অস্থির দেখাচ্ছে মেয়েকে। তাও স্বাভাবিক করতে বললেন, 

- চল ব্রাশ করে নেয়, 

তন্নি দ্রুত পেছনে দিকে গেল। 

-আমি করে ফেলেছি আব্বু ব্রাশ। 

বলেই এইদিক ওদিক তাকাচ্ছে। 

আজিজ সাহেব এইবার বলেই ফেললেন, 

- কি হয়েছে মা তোর? কিছু হয়েছে? 

- না আব্বু কিছু হয় নি। তুমি একটু মাকে ডেকে দাও। আমি স্কুল ড্রেস টা খুঁজে পাচ্ছি না। 

আজিজ সাহেব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন ব্যালখনি ড্রেস ঝুলছে। উনি আর কথা না বাড়িয়ে বের হয়ে গেলেন রুম থেকে। 

তন্নির মা শান্তা রান্না ঘরে রুটি সেকছিলেন। আজিজ সাহেব কে দেখে বললেন, 

-উঠলো তোমার নবাবজাদী? 

আজিজ সাহেব মাথা নাড়িয়ে বললেন,

- উঠেছে তবে - 

-তবে কি? এখনো ঝিমাচ্ছেন এখনো বেতের বাড়ি পরে নাই তো। 

আজিজ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,

-যাও তো তোমাকে ডাকছে মেয়ে। 

রুটি এইপিঠ থেকে অন্যপিঠ উল্টাতে উল্টাতে ভাজির ঢাকনা খুলে একটু নেড়ে দিলেন, আলু ফুলকপি আর গাজর দিয়ে ভাজি দারুন এক সুঘ্রাণ বের হল। 

- এখন আমি কীভাবে যাব? তোমাদের নাস্তা রেডি হয়েছে? দাঁড়াও আমি ডাক দিচ্ছি- 

আজিজ সাহেব শান্তার হাত থেকে কুন্তীটা নিয়ে নিলেন, নিয়ে বললেন,

- আহ, সব সময় বকাবকি৷ যাও না কি হয়েছে দেখ না মেয়েটার। কেমন যেন করছে। মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছে। তোমাকে ডাকছে। 

শান্তা আজিজ সাহেবের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকালেন। 

তারপর চুলা ছোট করে বের হলেন। বললেন, 

-রুটি ভালো করে এইপিঠ ওপিঠ সেঁক।  

 শান্তা তন্নির রুমে গেলেন। তন্নি তখন তাড়াতাড়ি বেডশিট তুলছিল, মাকে দেখে থেমে গেল সে।

বলল, 

-আমি কিছু করি নি, জানি না কীভাবে-?  

শান্তা কিছু বলল না, মেয়ের হাত ধরে ঘুরিয়ে পেছনে প্যান্ট দেখলেন। 

যা ভেবেছেন তাই। তন্নি ভয়ে ভয়ে তাকালো মায়ের দিকে। 

মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, 

- ভয় নেই। কিছু হবে না। তোর পিরিয়ড শুরু হয়েছে। সবার হয়। 

আমি কিছু জিনিস এনে দিচ্ছি পরে নেয়। 

বেডশিট টা ওয়াশরুমে রাখ আর প্যান্ট চেঞ্জ করে নেয়। 

বলেই রুম থেকে বের হলো। মেয়ের জন্য তুলে রাখা নতুন প্যান্ট আর প্যড নিলেন আলমারী থেকে। 

আজিজ সাহেব রান্না ঘর থেকে উঁকি মারলেন,

শান্তা কাপড়ের নিচে করে নিয়ে গেল মেয়ের রুমে। 

আজিজ সাহেব শান্তার পেছন পেছন এলেন, তন্নির রুমে ঢোকার আগেই শান্তা বিরক্তি নিয়ে বলল, 

-আহ তুমি কেন আসছো? যাও তমাল কে রেডি করে নাও। 

আজিজ সাহেব অনেকক্ষন ধরে সোফায় বসে রইলেন। আঁচ করতে পেরেছেন কি হয়েছে তন্নির। 

শান্তার যখন পিরিয়ড হয় কেমন ব্যাথায় কুকড়ে থাকে দেখেছে এতগুলো বছর পর ও। 

তার এই ছোট্ট মেয়েটা কীভাবে নেবে এত ব্যাথা ভাবতেই বুকের উপর কেউ যেন পাথর বসিয়ে দিচ্ছে। 

তমাল কে ড্রেস পরিয়ে দিলো। শান্তা এসে টেবিলে নাস্তা দিলো। 

আজিজ সাহেব চুপ করে রইলো, তন্নির রুমের দরজা বন্ধ। 

আজিজ সাহেব শান্তার দিকে তাকিয়ে বলল, 

- তন্নি খাবে না? 

-খাবে একটু পর, তুমি খেয়ে তমাল কে নিয়ে বের হয়ে যাও। 

- তন্নী স্কুলে যাবে না? 

- না, আজ না যাক। তুমি তমাল কে নিয়ে যাও। স্কুলে আমি ফোন করে দিব। 

অনেক কিছু বলার থাকলেও কিছু বললেন না, 

বলতে পারছেন না। কেন জানে না। 

খাবার খেয়ে যাওয়ার আগে মেয়ের রুমে উকি দিলেন, 

রুমে উকি দিয়ে দেখলেন তন্নী রুমে নেই। ওয়াশরুমে পানির আওয়াজ হচ্ছে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দেখলেন,

তন্নি ওয়াশরুমে তার বেডশিট টা ধুচ্ছে। 

মেয়েকে ডেকে বলল, 

- তন্নি তুই কেন এইসব ধুচ্ছিস। রাখ। উঠে আয়। 

তন্নি ক্লান্ত চোখে তাকালো, আজিজ সাহেব কিছু না বলে মেয়েকে টান দিয়ে তুলে দিলেন। 

অফিসের প্যান্ট টা একটু তুলে বেডশিট টা পানিতে ডুবিয়ে নিজেই তুলে ধুয়ে দিলেন। 

তখন তন্নির দাদী কোথেকে যেন এসে হুংকার ছাড়লেন, 

- তুই এই নোংরা কাপড় কেন ধরতে গেলি? ছাড়, যা অফিসে যাওয়ার আছে অফিসে যা। 

আজিজ অবাক হয়ে তাকালো, কিছু বলতে যাবে তার আগেই শান্তা এসে আজিজ সাহেব কে তাড়াতাড়ি টান দিয়ে বের করে আনলেন। 

- তোমার আক্কেল জ্ঞান কি সব লোপ পেয়েছে? কেন ধরতে গেলে?

- কি হয়েছে তোমরা এমন করছো কেন? 

আর ওকে দিয়ে এই সময়-

 আর কিছু বলতে পারলেন না উনি। দেখলেন মেয়ে লজ্জা পাচ্ছে।  

শান্তা টেনে রুমের বাইরে নিয়ে এলো আজিজ কে। বলল, 

- তোমার মেয়ে এত ননীর পুতুল ও নয় সেই এই সামান্য কাজ পারে। তুমি কেন ধরতে গেলে নোংরা বেডশিট।?  

- শান্তা তুমিও এই যুগে এসে এইসব বল, নোংরা পবিত্র অপবিত্র? 

বেশ বিরক্তি নিয়ে কপালে চলে আসা চুল সড়িয়ে বলল, 

- দেখ আমিও যথেষ্টই আধুনিক। আমি মেয়েকে কোন ভয় লাগায় নি। আমি খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছি মেয়েকে। আমি আমার মা হওয়ার দায়িত্ব ঠিক মতোই পালন করছি। তুমিও বাবার মতো থাক এইবার। 

এখন আর বলতে পারবে না তোমার মেয়ে পিচ্ছি। তোমার মেয়ে এখন সত্যিই বড় হয়ে গেসে৷ তোমার মেয়ে এখন নারী হয়ে উঠছে। 

যাও এইবার অফিসে যাও। 

আজিজ সাহেব আর কিছু বলতে পারলেন না। চুপ করে তমাল কে নিয়ে বের হচ্ছিলেন। 

তমাল যাওয়ার আগে ওর মাকে জিজ্ঞেস করল, 

- আম্মু আপু যাবে না স্কুলে কি হয়েছে ওর? 

শান্তা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

- কিচ্ছু হয় নি, ওর একটু পেট ব্যাথা। তুমি যাও স্কুলে। 

আজিজ সাহেবের সারাদিন অফিসে মন বসে নি। জানে শান্তা যথেষ্ট আধুনিক আর শিক্ষিত একটা মেয়ে তারপর ও এখনো কিছু গোড়ামী রয়েই গেসে। এত স্বাভাবিক একটা জিনিস কে এখনো কেন এত অস্বাভাবিক ভাবে নেওয়া হয় তা জানা নেই।  

সকালে মেয়ের ভয় পাওয়া চেহেরাটা কোন কিছুতেই আজ মন বসাতে দিচ্ছে না।

আজিজ সাহেব রাতে ফিরলেন তখন প্রায় রাত এগারোটা। সবাই ঘুমিয়ে পরেছে। 

শান্তা জেগে আছে, দরজা খুলতেই বলে উঠলো,

-এত দেরি যে? 

আজিজ সাহেব কিছু না বলে চুপচাপ ঘরে ঢুকে টেবিলের উপর বড় একটা প্যাকেট রাখলেন। শান্তা অবাক হয়ে তাকালো। এত বড় প্যাকেটে কি? 

আজিজ সাহেব কিছু না বলে তন্নির রুমের দিকে গেলেন। তন্নি শুয়েই ছিল বাবাকে দেখে কেমন যেন কুকড়ে গেল। 

বিছানায় বসল। একদিনেই কেমন যেন মলিন ফুলের মতো লাগছে মেয়েটাকে। 

আজিজ সাহেব তন্নির মাথায় হাত রেখে আলতো স্বরে বললেন, 

- বেশি ব্যাথা হচ্ছে মা? 

না বোধক মাথা নেড়ে আবার ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ল তন্নি। 

আজিজ সাহেব মেয়ের মাথাটা বুকে টেনে নিলেন। 

একটু তন্নি স্বাভাবিক হলে ওকে বললেন, 

-চল তোর জন্য একটা সারপ্রাইস এনেছি।  

তন্নির চোখে মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো। তন্নি রুমের বাইরে আসতে। দেখল ওর মা রাগী চেহেরা করে তাকিয়ে আছে। টেবিলের উপর বিশাল একটা কেক। 

-আয়, 

মেয়ের হাত ধরে টেবিলের কাছে নিয়ে এলেন। 

শান্তার দিকে তাকিয়ে আজিজ সাহেব বললেন, 

- তুমি তো বলেছো মেয়ে এখন মেয়ে নয় আর নারী হয়ে উঠছে। 

তাই আমার মেয়েকে নারী হওয়ার জন্য অভিবাদন দিতে হবে না? নতুন জম্মের নতুন সেলিব্রেশন। এত স্বাভাবিক ব্যাপার নিয়ে কেন ওর মধ্যে ভয় থাকবে? বল। 

শান্তা কিছু বলতে পারলো না। আজিজ সাহেব তার ছেলে তমাল কে আর তার মাকে ডেকে আনলেন। 

ব্যাপার টা মূহুর্তেই কেমন যেন আনন্দঘন হয়ে গেল। 

তন্নির দাদী প্রথমে বিরক্তি নিয়ে এনে ছেলেকে অধিখ্যাতার জন্য বকা দিলেও এরপর কেমন যেন চুপ হয়ে গেলেন।  

কারণ কেকের উপর খুব সুন্দর করে লেখা আছে, 

'' Happpy womenhood''

সবাইকে একসাথে ডেকে দাঁড়িয়ে বললেন,

-আমার মেয়ে আজ থেকে নারী হতে শুরু করেছে। কঠিন এই যাত্রায় পা দিয়েছে। প্রতি মাসে অসহ্য এই যন্ত্রনা ভোগ করবে। বড় হবে। শিখবে ধর্য্য সহ্য। তাই আজকের দিন টা তো আমাদের না লুকিয়ে ভয় না দেখিয়ে, সুন্দর করে পালন করার দিন।  

আজিজ সাহেব খেয়াল করলেন তন্নির চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। তমাল চেয়ারে উঠে দাঁড়িয়ে তন্নির চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল, 

- তোমার কোন কষ্ট হলে আমাকে বলবে৷ আমি আছি তো। আমি তোমার হোমওয়ার্ক ও করে দেব। 

তন্নি চোখের পানি মুছতে মুছতে হেসে দিল। 

-আগে নিজের টা কর গাধা। 

তন্নির দাদীও তন্নীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, 

- আমরা কত লুকিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি এইসব। যন্ত্রনা হলে মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারি নি। 

তুই আমাকে বলবি। 

তন্নি মাথা নাড়ে। শান্তাও মেয়ের কপালে আলতো একটা চুমু দেয়।  

সবাই মিলে কেক কাটে। ব্যাপার টা কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগছে তন্নির কাছে। 

তন্নি তার বাবার দিকে তাকালো কারণ এই রূপকথার কারিগর তো বাবা। 

যদি সবার বাবা ভাই এইভাবে এই সময় টাকে রূপকথা বানাতো তাহলে কাউকে আর এই স্বাভাবিক দিন টাকে অসুন্দর ভাবে কাটাতে হতো না। 

তন্নি কেকের উপর জ্বালানো মোমবাতিতে ফু দিয়ে বলল, সবার নারী হয়ে উঠা রূপকথা হোক। 


গল্প - নারীর_রূপকথা

দোলনা বড়ুয়া তৃষা



No comments

Powered by Blogger.